দেশের অর্থনীতিতে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ঘটাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, লেনদেনের খরচ কমানো এবং সরকারের রাজস্ব আদায় শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে সামান্য উন্নতি হলেও দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় কর আদায়ের পরিমাণ এখনো সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, আর্থিক লেনদেনের বড় অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা গেলে করের আওতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ সহজ হবে। এতে আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং এতদিন আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে থাকা বিভিন্ন কার্যক্রমকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি প্রতিবেশী পাকিস্তানের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, দেশটি আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক ফল পেয়েছে। পাকিস্তানের ফেডারেল বোর্ড অব রেভিনিউর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে দেশটির কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশেও নগদনির্ভর লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে পারলে রাজস্ব ব্যবস্থায় একই ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
১ নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআরে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে টাকা পাঠানোর সুবিধা
ডিজিটাল লেনদেনকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ করতে আগামী ১ নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে (পিটুপি) অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন ব্যবস্থায় গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তির কিউআর কোড স্ক্যান করে কিংবা কোডের ছবি আপলোড করে টাকা পাঠাতে পারবেন। অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবগুলোর মধ্যে এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
এতদিন বাংলা কিউআরের ব্যবহার মূলত দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন সুবিধা চালু হলে ব্যক্তিগত লেনদেনেও এর ব্যবহার বাড়বে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বল্প আয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য এটি নগদ টাকার বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ সুবিধা বাস্তবায়নে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের নিজ নিজ অ্যাপে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এর আগে গত ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কাছে লেনদেনের অর্থ তাৎক্ষণিক পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপ ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমাবে এবং ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করবে।
নগদ টাকার লেনদেনে বছরে ব্যয় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা
দেশের অর্থনীতিতে নগদ টাকা ব্যবহারের পেছনে কত বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে, তা উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গবেষণায়।
দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে নগদ অর্থের লেনদেন পরিচালনায় বছরে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ২০২৩ সালের জিডিপির হিসাবে এটি ৩ দশমিক ২৪ শতাংশের সমান।
অন্যদিকে পুরো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ।
মাথাপিছু হিসাবেও দুই ব্যবস্থার ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। নগদ অর্থের লেনদেনে বছরে জনপ্রতি প্রায় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা খরচ হয়। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় মাত্র ৩৪৮ টাকা।
গবেষণায় দেখা যায়, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় শুধু ব্যাংকগুলোরই বছরে প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। সাধারণ গ্রাহকদের ব্যয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ব্যয় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
এসব ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে নতুন ব্যাংক নোট ছাপানো, টাকা পরিবহন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকের শাখা ও এটিএম পরিচালনা এবং নগদ টাকা উত্তোলন ও ব্যবহারে মানুষের ব্যয় করা সময়ের অর্থনৈতিক মূল্য।
মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক নোট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে নোট ছাপানো, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারে সরবরাহের প্রতিটি ধাপেই উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়।
পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবহারে নোট পুরোনো, ছেঁড়া বা নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলো পরিবর্তন করতে হয়। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এসব ব্যয়ের একটি অংশ সাশ্রয়ের পাশাপাশি অর্থ চুরি, অপব্যবহার ও দুর্নীতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা কতটা?
ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কর আদায় বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২২ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ: সিলেক্টেড ইস্যুজ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি কার্যক্রমের ডিজিটাল রূপান্তর বিশ্বের সবচেয়ে সফল দেশগুলোর পর্যায়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজস্ব আদায় জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশের সমপরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ব্যক্তিগত আয়কর এবং করপোরেট আয়কর আদায়ে দক্ষতা বাড়িয়ে এই সুফল পাওয়া যেতে পারে।
তবে আইএমএফের এই হিসাব সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি নির্দিষ্ট দুই বছরের মধ্যে রাজস্ব আদায় বাড়ার নিশ্চয়তা নয়।
অর্থনীতিবিষয়ক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর আদায় বাড়বে না। এর জন্য কর প্রশাসনের দক্ষতা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের সক্ষমতাও উন্নত করতে হবে।
কর ফাঁকি শনাক্তে কাজে আসতে পারে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য
নগদ টাকার লেনদেনে অনেক সময় অর্থের উৎস, গন্তব্য এবং লেনদেনের প্রকৃত পরিমাণ শনাক্ত করা কঠিন হয়। বিপরীতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন হলে তার একটি ইলেকট্রনিক রেকর্ড তৈরি হয়।
প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে এসব তথ্য ব্যবহার করা গেলে কর কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে পারে।
এর মাধ্যমে করের আওতার বাইরে থাকা আয় শনাক্ত, ভ্যাট আদায়ে অনিয়ম চিহ্নিত এবং কর আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করাই যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে কর প্রশাসনের তথ্য বিনিময়, ইলেকট্রনিক ভ্যাট চালান, অনলাইনে কর রিটার্ন জমা এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর পরিশোধের সুবিধাও আরও কার্যকর করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিভিন্ন পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে যেসব ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, সেগুলোকে ধীরে ধীরে মূলধারায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। এতে একদিকে ব্যাংক ও গ্রাহকদের পরিচালন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে আগামী দুই বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানোর লক্ষ্য যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী। এই অগ্রগতি নির্ভর করবে ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর।
বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য ডিজিটাল লেনদেন সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করা না গেলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে। এর ফলে রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের জন্য নিজস্ব অর্থের জোগান বাড়ানোর সুযোগও সৃষ্টি হবে।

