বাজারে ডলারের দর বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে এই ডলার বিক্রি করা হয়। বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে বলে ব্যাংকাররা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ডলারের চাহিদা ছিল ৮০ কোটি ডলার। তার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোগান দিয়েছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ চাহিদার একটি অংশ মেটানো হয়েছে রিজার্ভ থেকে, বাকিটা ব্যাংকগুলোকে বাজার থেকেই সংগ্রহ করতে হয়েছে। এর আগে গত ২০ অক্টোবর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই হিসাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিক্রির দর বেড়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, বুধবার সকালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউসগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার প্রস্তাব পায়। কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরেও ডলার কিনেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রির পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। তখন রেমিট্যান্স হাউসগুলো আগের তুলনায় কম দরে ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিতে শুরু করে। এতে বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ বাজারের দর নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে।
ডলারের বাজারে চাপ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বুধবার ৩০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক পেমেন্ট নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। একই সঙ্গে মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয় তুলনামূলক কম আসে। ফলে ডলারের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সরবরাহ বাড়েনি। এক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বৈদেশিক পেমেন্ট বেশি থাকায় গত কয়েক দিনে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্বালানি আমদানির মতো বড় অঙ্কের দায় একসঙ্গে এসে পড়লে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হয়।
আরেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলোতে ডলারের চাহিদা রয়েছে এবং চলতি মাসে আরও কয়েকটি বড় পেমেন্ট বাকি আছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। তাঁর মতে, আরও কয়েক দফা ডলার বিক্রি করা হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ডলার বিক্রির নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে শেষ পর্যন্ত ওই দিন রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করা হয়নি। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। এর মধ্যে একদিনেই বিক্রি হয়েছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা পুরো অর্থবছরের বিক্রির সিংহভাগ। এ থেকে স্পষ্ট, বুধবারের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
অন্যদিকে রেমিট্যান্সের চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে প্রবাসীরা দেশে ২৫৪ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। তবে মাসের শেষ দিকে এই প্রবাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ডলারের দর স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখন বাজার সামলানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তবে রিজার্ভ থেকে বারবার ডলার বিক্রি করলে মজুত কমার ঝুঁকিও থাকে। তাই জ্বালানি আমদানির বড় পেমেন্টের সময় আগাম পরিকল্পনা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার উদ্যোগ জরুরি। মাসের শেষে অতিরিক্ত পেমেন্টের চাপ থাকলে ডলারের দর আবারও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে আগামী কয়েক দিন বাজারের গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।

