বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা খাত দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন অর্থ স্থানান্তর, কার্ডভিত্তিক লেনদেন এবং ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের ফলে আর্থিক সেবা আগের তুলনায় সহজ ও দ্রুত হয়েছে। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি। ব্যাংকের ওয়েবসাইট, গ্রাহকের তথ্য, লেনদেনের অনুমোদনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা এখন দূর থেকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।
অক্টোবর ২০২৬-এ পিএইচপি প্রোগ্রামিং ব্যবস্থার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। বাংলাদেশ সরকারের কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম—বিজিডি ই-গভর্নমেন্ট সার্ট—২২ অক্টোবর ‘পিএইচপি২শেল’ নামে পরিচিত দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করে। ২৫ অক্টোবর সংস্থাটি আরও জানায়, দেশের সরকারি, বেসরকারি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কিছু ইন্টারনেট-সংযুক্ত ওয়েবসাইটে পুরোনো বা ঝুঁকিপূর্ণ পিএইচপি সংস্করণ শনাক্ত হয়েছে। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট পুনরায় চালু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি এবং সে সময় লেনদেনের ওপর তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ছিল না। অর্থাৎ, নিরাপত্তা সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটলেও সেটিকে সফল সাইবার হামলার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
তবে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে: কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দুর্বলতা থাকলে তা কেবল অনলাইন তথ্য প্রদর্শনের সমস্যা নয়; সঠিকভাবে প্রতিরোধ করা না গেলে তা বৃহত্তর প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু হামলার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করা, সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা, সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
পিএইচপি দুর্বলতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা, যা বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবস্থার নির্দিষ্ট দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো পরিস্থিতিতে অনুমোদন ছাড়াই দূর থেকে সার্ভারে ক্ষতিকর নির্দেশ চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের আক্রমণকে প্রযুক্তির ভাষায় দূরবর্তী কোড কার্যকর করার ঝুঁকি বলা হয়। আক্রমণকারী সফল হলে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, তথ্য চুরি, ওয়েবসেবা অচল করা কিংবা আরও আক্রমণের পথ তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে।
বিজিডি ই-গভর্নমেন্ট সার্টের ২২ অক্টোবরের সতর্কতায় পিএইচপি ব্যবস্থার দুটি গুরুতর দুর্বলতার কথা বলা হয়। ২৫ অক্টোবরের আরেকটি সতর্কতায় পুরোনো, অসমর্থিত অথবা নিরাপত্তা সংশোধন প্রয়োগ করা হয়নি—এমন সংস্করণ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। সংস্থাটি পিএইচপির সংস্করণ শনাক্ত করা, নিরাপত্তা সংশোধন স্থাপন, অসমর্থিত সংস্করণ পরিবর্তন, প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে জনসাধারণের প্রবেশ সীমিত করা এবং সন্দেহজনক কার্যক্রমের লগ পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেয়। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত সার্ভার বা হোস্টিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চিত হতে হবে যে বাস্তবে ব্যবহৃত পিএইচপি সংস্করণটি নিরাপদ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ওয়েবসাইটের সফটওয়্যার বা নকশা হালনাগাদ করলেই তার পেছনে ব্যবহৃত পিএইচপি ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না। ওয়েবসাইটের মূল সফটওয়্যার, সার্ভার, তথ্যভান্ডার, সংযুক্ত অ্যাপ্লিকেশন এবং তৃতীয় পক্ষের সেবাগুলোর নিরাপত্তা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে; তবে এটি স্থায়ী সমাধানের বিকল্প নয়।
‘ডিজিটাল হাইস্ট’: অপরাধের বদলে যাওয়া কৌশল। ‘ডিজিটাল হাইস্ট’ বলতে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ চুরি বা অবৈধভাবে স্থানান্তরের ঘটনাকে বোঝানো হয়। এ ধরনের অপরাধে সব সময় সরাসরি ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থা ভেঙে প্রবেশ করতে হয় না। কখনো কর্মীর পরিচয়পত্র ও প্রবেশসংকেত চুরি, কখনো ক্ষতিকর সফটওয়্যার, কখনো ভুয়া ওয়েবসাইট, আবার কখনো গ্রাহকের পরিচয় নকল করে অপরাধ সংঘটিত হয়। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এসব পদ্ধতি আরও জটিল হয়েছে।
২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার চুরির ঘটনা এই ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। সে সময় অপরাধীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোতে অনুপ্রবেশ করে এবং নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ পাঠায়। প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরানোর চেষ্টা করা হলেও সব নির্দেশ কার্যকর হয়নি। পাঁচটি স্থানান্তর নির্দেশের মাধ্যমে মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হয়—এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনে এবং ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কায় যায়।
শ্রীলঙ্কায় পাঠানো ২০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেনটি অর্থ প্রাপকের নাম লেখার ভুলের কারণে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। ‘Foundation’ শব্দটি ভুলভাবে লেখা হয়েছিল; মধ্যবর্তী ব্যাংক বিষয়টি যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওই অর্থের স্থানান্তর আটকে যায় এবং অর্থ ফেরত আসে। বিপরীতে, ফিলিপাইনে পাঠানো ৮১ মিলিয়ন ডলার বিভিন্ন হিসাব ও জুয়ার ব্যবসার মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর অধিকাংশ অর্থ দীর্ঘদিন ধরে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা দেখায়, আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণ, একাধিক স্তরে অনুমোদন এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ঘটনার শিক্ষা কেবল শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ অস্বাভাবিক কি না, প্রাপকের তথ্য সঠিক কি না, লেনদেনের পরিমাণ ও ধরন প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব বিষয়ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করতে হয়। পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেন থামিয়ে দ্রুত মানবিক যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
মুখের ছবি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মুখের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার বাড়ছে। অনেক ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রাহক পরিচিতি যাচাইয়ের জন্য ইলেকট্রনিক গ্রাহক-পরিচিতি যাচাই বা ই-কেওয়াইসি ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এতে গ্রাহকের পরিচয়পত্র, মুখের ছবি, ভিডিও এবং কখনো জীবন্ত ব্যক্তির উপস্থিতি যাচাইয়ের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এসব তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে তা পরিচয় জালিয়াতির নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
বিজিডি ই-গভর্নমেন্ট সার্ট ২১ জুলাই ২০২৬-এ ‘গোল্ডপিকঅ্যাক্স’ ও ‘গোল্ডফ্যাক্টরি’ নামের ক্ষতিকর সফটওয়্যার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধী কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করে। সতর্কতা অনুযায়ী, গোল্ডপিকঅ্যাক্সের কিছু সংস্করণ ব্যবহারকারীর মুখের জৈবিক তথ্য, পরিচয়পত্র ও প্রমাণীকরণ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে। ভুক্তভোগীকে ভুয়া ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে মুখের ভিডিও ধারণ এবং পরিচয়পত্র পাঠাতে প্রলুব্ধ করা হয়। সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন নকল ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা কিছু পরিচয় যাচাই ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
সতর্কতায় আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের হুমকি মোবাইল আর্থিক সেবা, ডিজিটাল পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাই এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের অর্থ এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে চুরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পৃথক ঘটনার প্রমাণ প্রয়োজন। সতর্কতাটি সম্ভাব্য হুমকি ও অপরাধীদের কৌশল সম্পর্কে সচেতন করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে শুধু মুখের ছবি বা ভিডিও যাচাইয়ের ওপর নির্ভর না করে একাধিক নিরাপত্তা স্তর ব্যবহার করতে হবে। নতুন যন্ত্র থেকে প্রবেশ, অস্বাভাবিক অবস্থান থেকে লগইন, হঠাৎ বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর কিংবা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের মতো ঘটনায় অতিরিক্ত যাচাই চালু করা যেতে পারে। গ্রাহককে অচেনা ওয়েবসাইটে পরিচয়পত্র, মুখের ভিডিও বা গোপন সংকেত না দেওয়ার বিষয়েও সচেতন করতে হবে।
মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবা দৈনন্দিন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, বেতন গ্রহণ, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং পরিবারের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ সেবার ব্যবহার ব্যাপক। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকের অর্থ ও পরিচয় সুরক্ষার দায়ও বেড়েছে। নিবন্ধিত হিসাবের সংখ্যা বা লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেই নিরাপত্তা সমান হারে উন্নত হয়েছে—এমন ধারণা করা যায় না।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোবাইল আর্থিক সেবায় মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা এবং আগস্টে তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। জুলাইয়ে নিবন্ধিত হিসাবের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ কোটি ৬৪ লাখ ৬০ হাজার। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই জুলাই ও আগস্টের লেনদেনের অঙ্ক অন্য একটি সংবাদে ২০২৫ সালের তথ্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মাসের মূল পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত এসব অঙ্ককে ২০২৬ সালের নিশ্চিত সরকারি তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক তার উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে মোবাইল আর্থিক সেবার নিবন্ধিত হিসাব, এজেন্ট ও লেনদেনসংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মাসভিত্তিক অঙ্ক ব্যবহারের আগে সেই মূল তথ্যভান্ডার থেকে সংশ্লিষ্ট সময়ের উপাত্ত মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
এখানে নিবন্ধিত হিসাবের সংখ্যা ও সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যার পার্থক্যও বিবেচনায় রাখতে হবে। একজন ব্যক্তি একাধিক সেবাদাতার কাছে হিসাব খুলতে পারেন; আবার নিবন্ধিত সব হিসাব নিয়মিত ব্যবহৃত হয় না। একইভাবে লেনদেনের মোট মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া মানেই প্রতারণা বেড়েছে—এমন নয়। প্রতারণার প্রকৃত চিত্র বুঝতে সক্রিয় হিসাব, লেনদেনের ধরন, অভিযোগের সংখ্যা, প্রতারণায় ক্ষতির পরিমাণ, অর্থ ফেরত পাওয়ার হার এবং সেবাদাতার প্রতিকারব্যবস্থার তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির হার ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ বলার ক্ষেত্রেও সময়কাল, হিসাবের ভিত্তি এবং মূল তথ্যসূত্র স্পষ্ট থাকা দরকার।
ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়বে, নিরাপত্তার ব্যর্থতার সম্ভাব্য প্রভাবও তত বিস্তৃত হতে পারে। একটি গ্রাহক হিসাবের তথ্য চুরি হলে ক্ষতি শুধু ওই গ্রাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; চুরি করা তথ্য অন্য প্রতারণায় ব্যবহার হতে পারে। তাই সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত লেনদেনের অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা, গ্রাহকের অভিযোগের জন্য সহজ ব্যবস্থা রাখা এবং সন্দেহজনক অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণার ফল ২০২২ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণায় বিবেচিত ব্যাংকগুলোর ৩৬ শতাংশ উচ্চ সাইবার ঝুঁকিতে এবং আরও ১৬ শতাংশ অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল। অর্থাৎ, দুই শ্রেণি মিলিয়ে অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংককে উচ্চ বা অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির আওতায় চিহ্নিত করা হয়েছিল। গবেষণাটি ২০২০ সালের ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতির ভিত্তিতে করা হয়েছিল। ফলে এই পরিসংখ্যানকে বর্তমান ব্যাংকগুলোর অবস্থা হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না; তবে এটি ঐতিহাসিকভাবে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল ও সচেতনতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের প্রমাণ।
সাইবার নিরাপত্তায় দুর্বলতার কারণ একাধিক। পুরোনো সফটওয়্যার, অসমর্থিত অপারেটিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সংশোধন দেরিতে প্রয়োগ, সীমিত প্রযুক্তিগত বাজেট, দক্ষ কর্মীর অভাব, তৃতীয় পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা—সবই ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি অনেক সময় নিরাপত্তাকে প্রযুক্তি বিভাগের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এবং গ্রাহকসেবা—সব পর্যায়ের সমন্বয় ছাড়া কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ ‘সাইবারসিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক, সংস্করণ ১.০’ প্রকাশ করেছে। এই কাঠামোর কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি করে। প্রকাশিত কাঠামোর নির্ধারিত বাস্তবায়ন-সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সময়সীমাকে কেবল আনুষ্ঠানিক নিয়ম হিসেবে না দেখে বাস্তব প্রস্তুতি ও ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা।
প্রথমত, সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি সম্পদের তালিকা তৈরি করতে হবে। কোন সার্ভারে কোন সংস্করণের সফটওয়্যার চলছে, কোথায় গ্রাহকের তথ্য রাখা হয়েছে, কোন সেবা বাইরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়—এসব তথ্য হালনাগাদ থাকা দরকার। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা সংশোধন দ্রুত প্রয়োগের পাশাপাশি অসমর্থিত সফটওয়্যার পর্যায়ক্রমে বাদ দিতে হবে। তৃতীয়ত, শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করলেই চলবে না; তা কার্যকর আছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
চতুর্থত, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। নিরাপত্তা তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম কেন্দ্রের মাধ্যমে সার্ভার, নেটওয়ার্ক, ব্যবহারকারীর প্রবেশ, অস্বাভাবিক লেনদেন ও সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে প্রযুক্তি কেনার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কর্মী, স্পষ্ট দায়িত্ব এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে তা পুনরুদ্ধার করা হবে, তথ্যের নিরাপদ অনুলিপি কোথায় রাখা হবে এবং কত দ্রুত সেবা চালু করা সম্ভব—এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত মহড়া চালাতে হবে।
ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক ও গ্রাহকের করণীয়। ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, আর্থিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দুর্বলতা পরীক্ষা, অনুপ্রবেশ পরীক্ষা এবং স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও হোস্টিং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। কোনো সেবা বাইরের প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলেও গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার দায় পুরোপুরি এড়ানো যায় না।
প্রতিটি ব্যাংকে সাইবার ঘটনার জন্য লিখিত প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা থাকা উচিত। সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত হলে কে সিদ্ধান্ত নেবেন, কোন ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কীভাবে জানানো হবে, গ্রাহককে কীভাবে সতর্ক করা হবে এবং প্রমাণ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—এসব আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে পরিকল্পনার দুর্বলতা খুঁজে বের করাও জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা হলো ন্যূনতম নিরাপত্তা মান নির্ধারণ, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, গুরুতর দুর্বলতা সম্পর্কে দ্রুত সতর্কতা এবং ঘটনার তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে সাইবার ঘটনার প্রতিবেদন দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান সুনামহানির আশঙ্কায় ঘটনা গোপন করলে একই দুর্বলতা অন্য প্রতিষ্ঠানেও অজানা থেকে যেতে পারে। তবে প্রতিবেদনব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় সতর্কতা দেওয়া যায়।
গ্রাহকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। অচেনা বার্তা বা লিংকে প্রবেশ করা, অননুমোদিত উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা, অপরিচিত ব্যক্তিকে এককালীন গোপন সংকেত বা পিন জানানো এবং ফোনে পরিচয় যাচাইয়ের নামে মুখের ভিডিও বা পরিচয়পত্র পাঠানো থেকে বিরত থাকা দরকার। ব্যাংকের পরিচয়ে কেউ যোগাযোগ করলেই তাকে বিশ্বাস করা যাবে না; প্রয়োজনে ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নম্বর বা অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ যাচাই করতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন হলে দ্রুত সেবাদাতাকে জানিয়ে হিসাব সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ডিজিটাল আস্থাও দুর্বল হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। আর্থিক সেবা সহজলভ্য হওয়া, দূরবর্তী এলাকায় লেনদেনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং দ্রুত অর্থ স্থানান্তর অর্থনীতির বহু ক্ষেত্রে সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত্তি হলো মানুষের আস্থা। গ্রাহক যদি মনে করেন তাঁর অর্থ, পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ নয়, তাহলে প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অক্টোবরের পিএইচপি নিরাপত্তা সতর্কতা, ২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনা এবং গোল্ডপিকঅ্যাক্সের মতো পরিচয়-চুরির হুমকি—প্রতিটি ঘটনা ভিন্ন ধরনের ঝুঁকি দেখায়। কোথাও সফটওয়্যারের দুর্বলতা, কোথাও আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদনব্যবস্থা, আবার কোথাও গ্রাহকের মুখের তথ্য ও ডিজিটাল পরিচয় অপরাধীদের লক্ষ্য। তাই একটি মাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে সব ঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব নয়।
প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রক তদারকি, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং গ্রাহক সচেতনতার সমন্বিত ব্যবস্থা। পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত পরিসংখ্যান প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা বজায় রাখা। মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনের পরিমাণ, নিবন্ধিত হিসাব কিংবা সাইবার ঘটনার সংখ্যা—যে তথ্যই ব্যবহার করা হোক, তার সময়কাল ও মূল উৎস স্পষ্ট থাকতে হবে। যাচাই না হওয়া তথ্যকে নিশ্চিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে প্রকাশ করলে নীতিনির্ধারণ ও জনআস্থার ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ডিজিটাল সেবা বাড়ানো নয়; সেই সেবাকে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা। সাইবার হামলার আশঙ্কায় সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো দুর্বলতা আগেই শনাক্ত করা, সময়মতো সংশোধন করা এবং কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো। ডিজিটাল লেনদেনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রযুক্তির গতি যতটা বাড়ছে, নিরাপত্তার সক্ষমতাও ততটা বাড়ানো যাচ্ছে কি না—তার ওপর।

