ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু পুঁজির অভাবে এগোতে পারছেন না, এমন তরুণদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামে নতুন একটি কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত ছাড়াও অর্থায়ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশের ৫৬ জেলার সব উপজেলার তরুণদের জন্য গত ১ নভেম্বর থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। আবেদন করা যাবে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট গত ১৩ সেপ্টেম্বর এসএমইএসপিডি সার্কুলার নম্বর ০৫-এর মাধ্যমে ‘উদ্যোগ (ইউডিওয়াইওজি)’ কর্মসূচির নীতিমালা প্রকাশ করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করা, তাঁদের ব্যবসায়িক ধারণা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। শুধু অর্থ দেওয়াই নয়, নতুন ব্যবসা পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরিতেও সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচিতে একজন উদ্যোক্তাকে ২০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হবে না। সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়নের অর্ধেক হবে ব্যাংকঋণ, বাকি অর্ধেক অনুদান। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ নিতে পারবেন এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে পাবেন।
ধরুন, কোনো তরুণ উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু করতে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন। চূড়ান্ত মূল্যায়নে এই প্রয়োজন যথার্থ মনে হলে তিনি ৬ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। আবার কারও ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও পুরো অঙ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন, ব্যয়ের পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
ঋণের ক্ষেত্রে একটি সুবিধা হলো, কোনো সহায়ক জামানত ছাড়াও ব্যাংক অর্থায়ন দিতে পারবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যাচাই-বাছাই ছাড়াই টাকা পাওয়া যাবে। আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ব্যাংকের নিজস্ব ঋণনীতি অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আর অনুদানের অর্থও নিঃশর্ত উপহার নয়। ব্যাংকঋণ ও অনুদান একই সময়ে এককালীন উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। নগদে টাকা দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে রূপান্তরিত হতে পারে। এ ছাড়া অর্থ বিতরণের সময় ঋণ ও অনুদানের সমপরিমাণ অর্থের পোস্ট ডেটেড চেক জমা দিতে হবে।
এই কর্মসূচিতে আবেদনের জন্য বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। তাঁর নিজের কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ থাকতে পারে, আবার নতুন ব্যবসা শুরুর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও থাকতে পারে। অর্থাৎ আগে থেকেই ব্যবসা চালু থাকা বাধ্যতামূলক নয়। একটি কার্যকর ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও আবেদন করা যাবে।
কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মাছ চাষ, পশুপালন, পর্যটন, সেবা খাত, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপসহ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বৈধ যেকোনো ব্যবসা এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে আবেদন করার সুযোগ থাকবে না। আগে ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে থাকলে আবেদনকারী যোগ্য হবেন না। কোনো ব্যাংকে ঋণখেলাপি হিসেবেও চিহ্নিত হওয়া যাবে না। সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এই অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হবেন না।
বর্তমানে দেশের অবশিষ্ট ৫৬ জেলার সব উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তারা আবেদন করতে পারবেন। আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে ১ নভেম্বর থেকে, চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
আগ্রহী আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে নিজের সংশ্লিষ্ট উপজেলায় অবস্থিত যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এসএমই পোর্টাল এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। ব্যাংকের শাখা থেকেও ফরম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবেদন করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আগে থেকে অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক নয়। এমনকি আবেদন জমা দিতেও কোনো ফি দিতে হবে না।
আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলে সেটি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসার ধারণা, প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবেন, তার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে।
আবেদন করলেই অর্থায়ন নিশ্চিত হবে না। আবেদনকারীর ব্যবসায়িক ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, বাজারে তার চাহিদা আছে কি না, আর্থিক পরিকল্পনা কতটা গ্রহণযোগ্য এবং উদ্যোগটি কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে, এসব বিষয় বিবেচনা করে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে।
এই বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রতিনিধি, সরকারি ও বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। নির্বাচিত হওয়ার পরও ব্যাংকের নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করে ঋণ অনুমোদন করা হবে। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়া মানেই চূড়ান্ত অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া নয়।
এ ছাড়া আবেদনকারীদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচিত উদ্যোক্তারা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন নেওয়া এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা পাবেন। বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির সুযোগও থাকবে।
কর্মসূচিটির প্রাথমিক পর্যায়ে আট জেলার ৬৪টি উপজেলা থেকে মোট ১৮ হাজার ৪৪৪টি আবেদন জমা পড়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এসব আবেদন নেওয়া হয়। জেলাগুলোর মধ্যে নেত্রকোণা থেকে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৩৫১টি আবেদন জমা পড়েছে। এরপর রয়েছে রংপুর ও নওগাঁ।
প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া সাড়া বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশের বাকি ৫৬ জেলায় কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে শুধু বড় শহর বা জেলা সদরের উদ্যোক্তা নন, উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণদেরও ব্যবসা শুরু করার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদান এবং জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সুযোগ। তবে ২০ লাখ টাকা সর্বোচ্চ সীমা, নিশ্চিত প্রাপ্তি নয়। প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন ও যাচাইয়ের ভিত্তিতেই অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। তাই যাঁরা আবেদন করতে চান, তাঁদের শুধু টাকার অঙ্কের দিকে না তাকিয়ে ব্যবসার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগবে তখনই, যখন সেই অর্থ দিয়ে টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে।

