যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিকে ঘিরে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করছেন, এ ধরনের চুক্তি জ্বালানি খাতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সীমিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজধানীতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত প্রাক্–বাজেট ছায়া সংসদ বিতর্কে তিনি বলেন, জ্বালানি আমদানির উৎস নির্ধারণেও যদি বাইরের প্রভাব থাকে, তাহলে তা নীতিগত সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের ঘোষিত বহুমুখী বৈদেশিক নীতির সঙ্গে এ বাস্তবতার অসামঞ্জস্য রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
বর্তমান জ্বালানিসংকটকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, জ্বালানি ও ব্যাংক খাত অর্থনীতির ‘ফুসফুস’ হিসেবে কাজ করলেও দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর নীতি, দেশীয় অনুসন্ধানে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে এই দুই খাতই এখন চাপে রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এখনো ঋণের কিস্তি ছাড় নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি এবং পূর্ববর্তী সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। তার ভাষায়, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে সেগুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ক্যাবিনেট সাবকমিটি গঠন করা হলেও এর কার্যকারিতা দৃশ্যমান নয়। বাস্তব সমস্যার সমাধান না হলে এসব উদ্যোগের ফলপ্রসূতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন—গরিবের করের টাকায় বড়লোককে ভর্তুকি না দেওয়া, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকারী হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সব মিলিয়ে, জ্বালানি খাত এখন শুধু অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি নীতি, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

