বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে পর্যাপ্ত মজুত সুবিধার অভাব। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি ও শিল্প উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আমিরুল হক এক সাক্ষাৎকারে জানান, বড় আকারে গ্যাস মজুতের সক্ষমতা তৈরি করা গেলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও দামের ওঠানামার প্রভাব অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। তার মতে, পর্যাপ্ত স্টোরেজ না থাকায় বাজার হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর বড় অংশই আসে গৃহস্থালি খাত থেকে, বিশেষ করে যেখানে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ নেই। শিল্প, বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং অটোগ্যাস মিলে বাকি অংশের চাহিদা তৈরি হয়।
গত এক দশকে পাইপলাইনে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের পর এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। তবে দেশীয় উৎপাদন প্রায় না থাকায় এই খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর আমদানি ব্যবস্থার কারণে দামের নির্ধারণে বৈশ্বিক সূচকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহৃত সৌদি আরামকো-এর কনট্রাক্ট প্রাইসের পরিবর্তন দ্রুত দেশীয় বাজারে প্রতিফলিত হয়। এতে ভোক্তারা বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব অনুভব করেন।
বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন—সবকিছুই এলপিজি সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরের মতো রুটে সমস্যা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দামে যুক্ত হয়। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলপিজি অপারেটর উপকূলীয় টার্মিনাল ও বোতলজাতকরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। তবে চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় অবকাঠামোগত সক্ষমতা এখনও সীমিত। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মজুত সক্ষমতা বাড়ানোই নয়, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য করাও জরুরি। অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি বাড়ানো গেলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। বন্দর ও টার্মিনাল অবকাঠামো উন্নয়নকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। কারণ লজিস্টিক জটিলতা থাকলে জাহাজ খালাসে বিলম্ব হয়, ব্যয় বাড়ে এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
দেশে এলপিজি খাতের সম্প্রসারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রেখেছে। গত এক দশকে বোতলজাতকরণ প্ল্যান্ট, সংরক্ষণাগার ও বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। দেশে এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, যা আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা হয়। যদিও এতে স্বচ্ছতা থাকে, তবে হঠাৎ বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি হলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা চাপের মুখে পড়েন।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের ওপর আকস্মিক চাপও কমবে। আগামী বছরগুলোতে নগরায়ণ বৃদ্ধির সঙ্গে এলপিজির চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাঠ বা জৈব জ্বালানির পরিবর্তে আধুনিক জ্বালানিতে ঝোঁক বাড়ার কারণে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
খাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা ৪০ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তবে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে এখনই মজুত সক্ষমতা বাড়ানো, সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করা, বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

