নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় আকারের এই সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে এর আর্থিক প্রভাব ও বাস্তবসম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি, যা দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনতে চায়। এজন্য প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে একটি বড় সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল মনে করছে, এত বড় ব্যয়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে বিদ্যমান সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় ও সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি।
ওয়াশিংটনে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে এই বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সেখানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেন, কিছু বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তবে তিনি জানান, আলোচনার মাধ্যমে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমাধানের পথ খোঁজা হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি কিস্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়া গেলেও বাকি অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন ব্যয় কর্মসূচি নিয়ে সংস্থাটির সতর্ক অবস্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুধু ফ্যামিলি কার্ড নয়, রাজস্ব আহরণ, বিনিময় হার নির্ধারণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও জোর দিচ্ছে।
সরকারি পক্ষ বলছে, বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করা কঠিন। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। তাই বড় ধরনের পরিবর্তন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছে তারা।
এদিকে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন বর্তমান নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই লক্ষ্য থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক-এর সঙ্গে আলোচনায় তুলনামূলক ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সংস্থাটি সরকারের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে অংশীদারিত্ব জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। একদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত ও আর্থিক শৃঙ্খলা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক চাহিদা—এই দুইয়ের সমন্বয় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথ পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ছাড়া বড় ব্যয়ের কর্মসূচি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আবার তা স্থগিত রাখলেও সামাজিক প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু এখন শুধু একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

