দেশে আমদানি কার্যক্রম ও নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় চলতি বছরের মার্চে ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে এলসি নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছে, যা দেশের বাণিজ্য প্রবাহে ধীরগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, মার্চ মাসে ব্যাংকগুলো মোট ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এলসি নিষ্পত্তি সাধারণভাবে আমদানিকারকের ব্যাংক থেকে রপ্তানিকারকের কাছে পণ্য সরবরাহের বিপরীতে চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া কমে যাওয়া মানে সরাসরি আমদানি কার্যক্রমে শ্লথতা।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও বিনিয়োগে গতি কমে যাওয়ায় এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে নতুন শিল্প স্থাপন ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় মোট এলসি প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও এই পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে। মার্চ মাসজুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, শিপমেন্ট অনিশ্চয়তা এবং ডলারের ভবিষ্যৎ দামের ওঠানামা নিয়ে উদ্বেগ ছিল ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ফলে অনেকেই নতুন এলসি খোলার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেন। অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, নির্বাচনের পর বিনিয়োগ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। বরং বাজারে অনিশ্চয়তা ও আস্থার ঘাটতি বিনিয়োগ প্রবাহকে আরও মন্থর করেছে।
একাধিক ব্যাংকার জানান, এলসি খোলার হারও মার্চে কমেছে। এই সময়ে প্রায় ১০ শতাংশের বেশি এলসি খোলা কমেছে, যা ভবিষ্যৎ আমদানি প্রবাহ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে যেসব এলসি খোলা হচ্ছে, তার বড় অংশই সরকারি খাতে, যেখানে বেসরকারি খাতে চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, ডলারের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দর ১২৩ টাকার আশেপাশে থাকলেও বর্তমানে তা কমে ১২২ টাকার ঘরে নেমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দাম কিছুটা কমছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি কমে যাওয়ার কারণে ডলারের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে, যা বিনিময় হারকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল রেখেছে। একই সঙ্গে রপ্তানি ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি কমে যাওয়াও সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহকে প্রভাবিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রবাহ দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকলে তা শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নীতিগতভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ চাঙা করা জরুরি। সব মিলিয়ে, মার্চ মাসের এলসি নিষ্পত্তির পতন দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রবাহে ধীরগতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

