মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাবে বিমানপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি বড় সংকটে পড়েছে। সবজি, ফল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিদেশে পাঠাতে এখন আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।
রপ্তানিকারকদের তথ্য বলছে, সংঘাতের আগে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডলার লাগত, এখন সেই ব্যয় বেড়ে ৬ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহন খরচ মধ্যপ্রাচ্যে ১২০–১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০–২৮০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে এই ব্যয় এখন ৬২০–৬৫০ টাকা, যা আগে ছিল ৪০০–৪৫০ টাকার মধ্যে।
বিমানভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্গো স্পেসের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে নিয়মিত চালান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে এবং অনেক রপ্তানিকারক তাদের ব্যবসা সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, মাসে যেখানে একাধিক চালান পাঠানো হতো, এখন তা প্রায় বন্ধের মুখে। অনেক ক্ষেত্রে এক মাসে একটি চালান পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না। ভাড়া বৃদ্ধির কারণে নতুন বুকিং দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে এবং কয়েক দিন পরপরই খরচ বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তুলনামূলক কম খরচে রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারলেও বাংলাদেশি পণ্যের পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা যাচ্ছে না। এতে রপ্তানি কমে যাওয়ায় কৃষিপণ্য দেশের বাজারেই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের আয়ে।
সরকারি পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সবজি রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার, মসলা ও পানীয়জাত পণ্যের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
এ অবস্থায় সামনে আসন্ন আম রপ্তানি মৌসুম নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই মৌসুমে বাংলাদেশি আমের আন্তর্জাতিক চাহিদা থাকে। তবে উচ্চ পরিবহন ব্যয় থাকলে এ খাতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদিত এসব ফলের খরচ আগেই বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষকরা উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে কৃষিখাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা দ্রুত কার্গো ভাড়া স্থিতিশীল করা এবং বিমান পরিবহন সুবিধা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না এলে কৃষিপণ্য রপ্তানি আরও সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

