বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের আয় নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরিরও নিচে। একই সঙ্গে ৭ শতাংশ শ্রমিক আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছেন।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইউএনএসকাপ) সম্প্রতি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের শ্রম ও বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের চাকরির অনিশ্চয়তা ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৯২ শতাংশ শ্রমিকের কোনো লিখিত চাকরির চুক্তি নেই। ফলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি সবসময়ই তাদের ওপর ভর করে থাকে। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্ট বা ঠিকা ভিত্তিক কাজ এবং বাসাবাড়িভিত্তিক উৎপাদনে যুক্ত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
ইউএনএসকাপ বলছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে আমদানি শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা বাড়লে রপ্তানি চাহিদা কমার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে আগে পড়বে অনানুষ্ঠানিক ও অস্থায়ী শ্রমিকদের ওপর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ ধরনের শ্রমিকদের সাধারণত কোনো নোটিশ ছাড়াই কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়। সামাজিক সুরক্ষা বা ক্ষতিপূরণের সুযোগও তাদের থাকে না। এমনকি নতুন করে নিয়োগের সময়ও তারা অগ্রাধিকার পান না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রপ্তানি কমে গেলে শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনমুখী শিল্পে দুই কোটি ৭০ লাখের বেশি চাকরি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক ও পাদুকা শিল্প বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বাড়লে অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মুনাফা কমানোর বদলে শ্রমিকদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা কমানোর পথ বেছে নিতে পারে। এতে আয়বৈষম্য ও দারিদ্র্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে উদ্বেগের পাশাপাশি বাংলাদেশের পোশাক খাতের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বিশ্বের বৃহত্তম একক পোশাক শ্রমিক বাহিনীর একটি রয়েছে বাংলাদেশে। বর্তমানে প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক এই শিল্পে কাজ করছেন। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।
নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণের দিক থেকেও বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের পোশাক খাতের প্রতি ১০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় সাতজন নারী। কম্বোডিয়ায় এই হার আরও বেশি হলেও পাকিস্তানে তুলনামূলক কম।
একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, কম্বোডিয়ার পোশাক, টেক্সটাইল ও পাদুকা খাতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। পাকিস্তানের উৎপাদনমুখী শিল্পে পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থানে। আর শ্রীলঙ্কায় আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বাইরে সমসংখ্যক শ্রমিক অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন, যারা উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

