রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খাতটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা, যা বিশ্ববাজারে শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোর তুলনায় বহু গুণ বেশি। এ পরিস্থিতিতে সরকার ধীরে ধীরে এই খাত থেকে সরে এসে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পথ খুঁজছে।
বিশ্বের বড় উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। ব্রাজিল ও ভারতে প্রতি কেজি কাঁচা চিনি উৎপাদন খরচ ৪০ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ বাংলাদেশে একই পণ্যের উৎপাদন ব্যয় সাতগুণ পর্যন্ত বেশি হওয়ায় বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি চিনিকলগুলো দেশের মোট চাহিদার খুবই সামান্য অংশ সরবরাহ করে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টন চিনির প্রয়োজন হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলো থেকে আসে মাত্র ১ শতাংশের মতো। অন্যদিকে এই মিলগুলোর ওপর ব্যাংকঋণের চাপ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং পুঞ্জীভূত লোকসানও কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শ্রমিকদের বেতন ও কৃষকদের আখের মূল্য পরিশোধে প্রতিবছরই সরকারের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার অতীতে পাটকল খাতে নেওয়া পদক্ষেপের মতো একটি কৌশল চিনিকলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের কথা ভাবছে। পরিকল্পনা কমিশনের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পাটকলগুলোতে স্বেচ্ছা অবসর দিয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে চিনিকলগুলোর মালিকানা বা পরিচালনায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লাভজনক অবস্থানে আছে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান, সেটিও মূলত চিনির ব্যবসা থেকে নয়, বরং অন্যান্য ইউনিটের আয় থেকে। এতে বোঝা যায়, মূল উৎপাদন কার্যক্রমেই কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
এর আগে বড় ধরনের লোকসানের কারণে কয়েক দফায় একাধিক চিনিকল বন্ধ করা হয়েছে। এখনো চালু থাকা মিলগুলোর বেশিরভাগই লোকসানে চলছে। একই সঙ্গে পুরোনো যন্ত্রপাতি, কম উৎপাদন সময় এবং উচ্চ জনবল ব্যয়—সব মিলিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। বছরের মাত্র কয়েক মাস উৎপাদন চালু থাকলেও কর্মচারীদের পুরো বছর বেতন দিতে হয়, যা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাজার বাস্তবতাও রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোর জন্য প্রতিকূল। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বিক্রয়মূল্য কম রাখতে হয়, ফলে প্রতিটি কেজিতে লোকসান গুনতে হয়। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচা চিনি আমদানি করে পরিশোধন করে বাজারে সরবরাহ করছে, যা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং লাভজনক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এসব প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া সরকারের জন্য টেকসই নয়। বেসরকারিকরণ বা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিচালনা করলে দক্ষতা বাড়তে পারে এবং আর্থিক চাপ কমবে।
তবে শিল্প মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এখনো আশাবাদী যে আধুনিকায়ন, আখ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনা সংস্কারের মাধ্যমে চিনিকলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যে পুরোনো যন্ত্রপাতি সংস্কার এবং কৃষকদের উৎসাহিত করার মতো কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সামনে এখন দুটি পথ—সংস্কারের মাধ্যমে টিকে থাকা, অথবা বেসরকারি খাতের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া। কোন পথটি বেছে নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের চিনি শিল্পের ভবিষ্যৎ।

