মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানিতে।
সৌদি আরব থেকে আসা এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি নতুন চালানেই সরকারের বাড়তি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা। একই পরিমাণ তেল আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি)।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ‘এমটি নাইনেমিয়া’ নামের জাহাজটি গত মঙ্গলবার সকাল ৬টায় যাত্রা শুরু করে। এতে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ১০০ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। প্রতি ব্যারেলের দাম পড়ছে ১২৬ দশমিক ২৮ ডলার।
যুদ্ধের আগে একই পরিমাণ তেলের জন্য খরচ ছিল প্রায় অর্ধেক। জানুয়ারিতে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা। তখন প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ৬২ দশমিক ৬৭ ডলার। অর্থাৎ নতুন চালানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানান, জাহাজটি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে পৌঁছাবে। এরপর শুরু হবে শোধন কার্যক্রম।
বাড়তি আমদানি ব্যয়ের প্রভাব ইতিমধ্যে দেশের বাজারে দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সম্প্রতি নতুন দাম নির্ধারণ করেছে। এতে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও আমদানিনির্ভরতা মিলিয়ে এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নতুন কোনো অপরিশোধিত তেল দেশে আসেনি। ফলে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে কাঁচামালের সংকট দেখা দেয়। এপ্রিলের শুরুতেই আগের মজুত শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে ডিজেল উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে, সীমিত পরিমাণে পেট্রল ও বিটুমিন উৎপাদন হচ্ছে।
স্বাভাবিক সময়ে এই রিফাইনারিতে দৈনিক ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টন তেল পরিশোধন হতো। তবে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদন খুবই সীমিত।
বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল। এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল থেকে সাধারণত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল, পেট্রল ও ফার্নেস অয়েল উৎপাদন করা যায়।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট ৬২ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল অপরিশোধিত তেল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের কারণে কয়েকটি জাহাজের সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। কিছু চালান আটকে গেছে, আবার কিছু চুক্তি বাতিল হয়েছে।
ঝুঁকি কমাতে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার বিকল্প উৎস বিবেচনা করছে বিপিসি। তবে নতুন উৎসে যেতে সময় ও ব্যয় দুই-ই বাড়ছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি দামে হলেও তেল আমদানি অব্যাহত রাখা হচ্ছে এবং মে মাসে আরও একটি চালান আনার চেষ্টা চলছে।

