রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে অর্থায়ন সংকট কাটাতে কম সুদে প্রি-শিপমেন্ট ঋণ সুবিধা আবারও চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল থেকে এই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারবে। এরপর গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করা যাবে। রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণের আগের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই এই ঋণ ব্যবহার করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রপ্তানিকারকেরা। ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থ সংকট কিছুটা হলেও কমবে এবং রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে। তাদের দাবি, এই সুবিধা উৎপাদন ব্যয় সামাল দেওয়া, শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রম অসন্তোষ কমাতেও সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রপ্তানিমুখী খাতে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসছে। তার মতে, ৫ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সহায়তা হবে এবং এতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাপের কারণে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পখাত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন সচল রাখা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রি-শিপমেন্ট ঋণ পুনরায় চালু করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো ৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি সেই তহবিলের মেয়াদ ২০২৫ সালের এপ্রিলে শেষ হয় এবং পরবর্তীতে তা নবায়ন করা হয়নি। তখনও ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ সুদে তহবিল গ্রহণ করে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ করত।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবার জানিয়েছে, নতুন এই স্কিমের মেয়াদ থাকবে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। একই সঙ্গে কোনো একক প্রতিষ্ঠান একই সময়ে সুদসহ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে পারবে না।
৯ এপ্রিল জারি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এই পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। ২০২৩ সালে গঠিত ১০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল থেকেই সর্বোচ্চ ৫ হাজার কোটি টাকা প্রি-শিপমেন্ট ঋণ হিসেবে পুনঃঅর্থায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত বছরের এপ্রিলে প্রি-শিপমেন্ট ঋণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন খাতে বড় ধরনের পুঁজি সংকট তৈরি হয়। তার মতে, পণ্য জাহাজীকরণের আগে উৎপাদন ব্যয় মেটাতে এই ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মাস শেষে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার প্রয়োজন হলেও পণ্য শিপমেন্ট না হওয়ায় অর্থ পাওয়া যেত না। তখন এই ঋণ থেকেই বেতন পরিশোধ করা হতো। তিনি আরও বলেন, ঋণ সুবিধা বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, আগে এলসির বিপরীতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হতো। কোভিড-পরবর্তী সময়ে ৫ শতাংশ সুদে বিশেষ তহবিল চালু হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে সেই সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালুর চেষ্টা দীর্ঘদিন সফল হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্তে আবারও ৫ শতাংশ সুদে এই সুবিধা চালু করা হয়েছে।

