লাভজনক অবস্থানে পৌঁছানোর পরও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ১০১ কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধ করছে না বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। একাধিক বৈঠক, চিঠি ও তাগিদের পরও অর্থ পরিশোধে অগ্রগতি না থাকায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, বিএসসির কাছে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত মাশুল বাবদ প্রায় ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, জায়গা ব্যবহারের ভাড়া বাবদ ১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অর্থ দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ না হওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুই সংস্থার মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএসসি এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত ৪৩ কোটি টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি বাকি অর্থ পরিশোধের জন্য একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। পরে আবার লিখিতভাবে তাগাদা দেওয়া হলেও সাড়া মেলেনি।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, বকেয়া অর্থের মধ্যে ভ্যাটের একটি বড় অংশ রয়েছে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু বিএসসির কাছ থেকে টাকা না পাওয়ায় সেই ভ্যাটও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সংস্থাটি নিজেও চাপের মধ্যে রয়েছে।
পেছনের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এক দশকেরও বেশি আগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় বিএসসির আর্থিক দুরবস্থার কারণে বন্দর চার্জ স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি উন্নতির পর বকেয়া পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ বর্তমানে সংস্থাটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
নথিপত্রে আরও দেখা গেছে, দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ করার অনুমতি নেওয়ার সময় বিএসসি একটি লিখিত অঙ্গীকার দেয়। সেখানে তাৎক্ষণিক কিছু অর্থ পরিশোধ করে বাকি অংশ মাসিক কিস্তিতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা হয়নি।
এদিকে বিএসসি যে জায়গা ব্যবহার করছে, তার জন্য নিয়মিত কর দিতে হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। অর্থাৎ একদিকে ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে কর পরিশোধের দায় বহন করতে হচ্ছে। এতে সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বকেয়া আদায়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এজন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, বিএসসির আর্থিক চিত্র ভিন্ন বার্তা দেয়। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব ও মুনাফা অর্জন করেছে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব এবং ৩০৬ কোটির বেশি নিট মুনাফা করে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য উল্লেখযোগ্য নগদ লভ্যাংশও ঘোষণা করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, লাভজনক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও কেন বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব করছে বিএসসি। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দায় পরিশোধে গড়িমসি করায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি স্পষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না হলে এটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে আর্থিক অনিয়মের একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

