দেশের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বড় একটি অংশ ঘিরে গড়ে উঠেছে একক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের অভিযোগ। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট আমদানির প্রায় চার-পঞ্চমাংশ সরবরাহ কার্যক্রম একটি চিকিৎসক পরিচয়ধারী ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, দেশে বছরে বিপুল পরিমাণ তরল জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার একটি অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় দেশে পরিশোধিত হয় এবং বাকিটা সরাসরি পরিশোধিত আকারে বিদেশ থেকে আনা হয়। এই পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মোট ১১টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী তালিকাভুক্ত থাকলেও স্থানীয় এজেন্ট কাঠামোর কারণে কার্যত বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই স্থানীয় এজেন্ট ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একজন চিকিৎসক পরিচয়ধারী ব্যবসায়ী ডা. এজাজুর রহমান তাঁর মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ কার্যাদেশ নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে পুরো সরবরাহ চেইনে একটি কেন্দ্রীয় প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উন্মুক্ত দরপত্র ও সরকারি পর্যায়ের চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি করা হয়। তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে স্থানীয় এজেন্টের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরবরাহ কাঠামোতে বাস্তবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।
সরবরাহকারী তালিকায় থাকা ১১টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধিক কোম্পানির স্থানীয় কার্যক্রম একই দুটি এজেন্সির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে নথিতে দেখা যায়। এতে বাজার প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ছে—এমন মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।
চলতি অর্থবছরের জ্বালানি সরবরাহ কার্যাদেশ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট আমদানির একটি বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বিভিন্ন প্যাকেজ ও মেয়াদভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এসব কার্যাদেশের বড় অংশ একই স্থানীয় এজেন্ট কাঠামোর আওতায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, তিনি কেবল শিপিং ও লজিস্টিক সহায়তা দেন এবং প্রকৃত দরপত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সরকারি পর্যায়েই হয়। তার ভাষায়, এখানে একক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সঠিক নয় এবং তিনি নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার অংশ নন।
অন্যদিকে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকলে তা বাজার প্রতিযোগিতা ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট একজন সাবেক অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, যুদ্ধ ও বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতার সময় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভরতা সীমিত গোষ্ঠীর ওপর থাকলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে কিছু চাপ তৈরি হলেও তা মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এদিকে বাজার কাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একক প্রভাবের অভিযোগ নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থায় সরবরাহ কাঠামো, স্থানীয় এজেন্ট প্রভাব এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও নীতিগত পর্যালোচনার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সূত্র: জাগো নিউজ

