আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাত এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে খাতটি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
গত তিন বছরে দেশের অন্তত চারশটি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না পেলে বন্ধ কারখানার সংখ্যা আরও বাড়বে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে পোশাক শিল্প মালিকদের দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাবনায় এই চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় তিরাশি শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্রেতারা পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বাড়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ডলারের অস্থিরতার কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির চাপও। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ছাপ্পান্ন শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন তাদের রপ্তানিকারকদের জন্য কর সুবিধা ও প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তৈরি পোশাক শিল্প মূলত ফ্যাশন ও সময়নির্ভর। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু বর্তমানে সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রম, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং বন্ড সুবিধার জটিলতার কারণে সময়মতো উৎপাদন ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে জাহাজ ভাড়া ও কার্গো বিমানের ভাড়াও বেড়ে গেছে। এতে রপ্তানি ব্যয় আরও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে আগের মতো জ্বালানি সংকট নেই এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তিনি জানান, বন্ধ কারখানাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং আগামী বাজেটে খাতটির জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নির্ধারিত সময়সীমা বা ‘লিড টাইম’ খুব কঠোরভাবে অনুসরণ করেন। সময়মতো পণ্য না পৌঁছালে তারা মূল্যছাড় দাবি করেন, অর্থ পরিশোধে দেরি করেন বা অর্ডার বাতিলও করেন। এতে রপ্তানিকারকদের সরাসরি ক্ষতি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানিতেও জটিলতা দেখা দিচ্ছে। নতুন ডিজাইন, কাপড়, রং ও এক্সেসরিজ ব্যবহারের কারণে আমদানির প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠছে। এইচএস কোড সংযোজন ও কাস্টমস যাচাইয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাঁচামাল খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে এবং জরুরি পণ্য আকাশপথে আনতে গিয়ে খরচ আরও বাড়ছে।
কর ব্যবস্থাপনাকেও বড় চাপ হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে করপোরেট করহার বারো শতাংশ এবং সবুজ কারখানার ক্ষেত্রে দশ শতাংশ হলেও বাস্তবে কর নির্ধারণের সময় অনেক ব্যয়কে অনুমোদনযোগ্য ধরা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ঘোষিত কর সুবিধার পূর্ণ সুফল মিলছে না। এছাড়া নগদ সহায়তার ওপর দশ শতাংশ উৎস কর শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ব্যবসায়ীরা এই হার শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশে নামানোর দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। তাই দ্রুত নীতিসহায়তা দেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণ কমে গেছে। এটি নতুন রপ্তানি আদেশ কমার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না পেলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে তারা এখনো আশাবাদী। তাদের মতে, কর ও ভ্যাট কাঠামো সহজ করা, বন্ড ও কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।

