বাংলাদেশের শহুরে জীবনে বাজার করার অভ্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁচাবাজারে যাওয়া ছিল বহু পরিবারের নিয়মিত কাজ। মাছের কানকো দেখে টাটকা কি না বোঝা, সবজি হাতে নিয়ে মান যাচাই করা, দরদাম করা—এসব ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু এখন শহরের ব্যস্ততা, যানজট, সময়ের চাপ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেক মানুষ সেই পুরোনো অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছেন।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠছে সুপারস্টোর বা সংগঠিত খুচরা বাজার। প্রায় পঁচিশ বছর আগে বাংলাদেশে প্রথম সুপারস্টোর চালু হলেও দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতের বাজার অংশ ছিল মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ, যার আর্থিক আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। মহামারির সময় অনলাইন ও সংগঠিত কেনাকাটার অভ্যাস বেড়েছে, আর সুপারস্টোরে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহারের পর এ খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। এখন এই বাজার বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে ধরা হচ্ছে।
এই বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, শহরের মানুষ এখন সময় বাঁচাতে চান। এক ছাদের নিচে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি, প্রসাধনী, ঘরোয়া পণ্য ও প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া গেলে আলাদা আলাদা দোকানে যাওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। দ্বিতীয়ত, সুপারস্টোরে পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ থাকে। দরদাম করতে হয় না, পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকে, আর অনেক সময় ছাড়ও পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, পণ্যের বৈচিত্র্য কাঁচাবাজার বা ছোট মুদিদোকানের তুলনায় বেশি থাকে।
তবে এর মানে এই নয় যে কাঁচাবাজারের গুরুত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং শহরের অনেক ক্রেতা এখন দুই ধরনের বাজারই ব্যবহার করছেন। মাসিক বাজার, প্যাকেটজাত পণ্য, আমদানি করা পণ্য বা ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস তারা সুপারস্টোর থেকে কিনছেন। অন্যদিকে তাজা শাকসবজি, দেশি মাছ বা দরদামের সুযোগ থাকা পণ্যের জন্য এখনো অনেকে কাঁচাবাজারেই যাচ্ছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্রেতারা পুরোপুরি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাননি; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটার ধরন বদলাচ্ছেন।
বাংলাদেশে এই খাতের পথচলা শুরু হয় ২০০১ সালে আগোরা চালুর মাধ্যমে। এরপর ২০০২ সালে মীনা বাজার আসে। ২০০৮ সালে এসিআই চালু করে স্বপ্ন, যা বর্তমানে আধুনিক খুচরা বাজারে বড় অবস্থান তৈরি করেছে। স্বপ্নের বর্তমানে ৯০২টি আউটলেট এবং আধুনিক খুচরা বাজারে ৫৩ শতাংশ অংশ রয়েছে। ২০১২ সালে যেখানে স্বপ্নের আউটলেট ছিল ৩৭টি, এখন সেটি ৯০২টিতে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধি দেখায় যে সংগঠিত খুচরা বাজার এখন শুধু পরীক্ষামূলক ধারণা নয়, বরং শহুরে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
প্রাণ গ্রুপের ডেইলি শপিং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ৭টি আউটলেট ও ৩০ জন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তখন বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১ কোটি টাকা। বর্তমানে তাদের আউটলেট সংখ্যা ১১২টি, কর্মী প্রায় ১ হাজার, আর মোট বিনিয়োগ প্রায় ৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও প্রায় ৩৫টি নতুন আউটলেট খোলার পরিকল্পনা করছে। এই তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, শুধু বড় ব্র্যান্ড নয়, মাঝারি ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল প্রতিষ্ঠানও এই বাজারে ভবিষ্যৎ দেখছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ। চলতি বছর স্বপ্ন জাপানের মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে। এর লক্ষ্য হলো অর্থায়ন ব্যয় কমানো এবং সেবার মান উন্নত করা। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার খুচরা বিক্রেতা আলফামার্ট ২০২৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কাজী ফার্মস গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তারা শহর ও আধা-শহর এলাকায় ছোট আকারের সুপারস্টোর চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রথম ধাপে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ কোটি মার্কিন ডলার, পরের ধাপে আরও ৭ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে গুলশান ও উত্তরায় তাদের দুটি আউটলেট খোলা হয়েছে।
এই বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশের খুচরা বাজারের জন্য একটি বড় সংকেত। এর অর্থ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে দেশের ভোক্তাদের অভ্যাস বদলাচ্ছে এবং সংগঠিত খুচরা বাজারে বড় সম্ভাবনা আছে। তবে একই সঙ্গে এটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা বাড়াবে। ক্রেতারা তখন শুধু দোকানের অবস্থান নয়, পণ্যের মান, দাম, পরিষেবা, ছাড়, পরিবেশ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা—সবকিছু বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই প্রতিযোগিতার নতুন দিক দেখা যাচ্ছে মেট্রোরেল স্টেশনকেন্দ্রিক সুপারস্টোরে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্রেশ সুপার মার্ট এখন মেট্রোরেল স্টেশন ঘিরে ছোট আকারের দোকান চালুর পথে এগোচ্ছে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছরের জন্য মেট্রো স্টেশনে ৯টি ফ্রেশ সুপার মার্ট আউটলেট পরিচালনার কথা রয়েছে। উল্লেখিত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে মতিঝিল, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর ১০, মিরপুর ১১, পল্লবী, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা উত্তর স্টেশন।
এই মডেলটি বাংলাদেশের জন্য নতুন হলেও বিশ্বের বড় শহরগুলোতে পরিচিত ধারণা। টোকিও বা লন্ডনের মতো শহরে যাতায়াতের পথের পাশে ছোট দোকান, খাবারের জায়গা বা দৈনন্দিন পণ্যের আউটলেট খুব সাধারণ বিষয়। ঢাকায় মেট্রোরেল চালুর পর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নির্দিষ্ট স্টেশন দিয়ে চলাচল করছেন। ফলে মেট্রো স্টেশন শুধু যাতায়াতের জায়গা নয়, ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফ্রেশ সুপার মার্টের লক্ষ্য বড় গন্তব্যভিত্তিক সুপারশপ বানানো নয়; বরং মানুষের চলাচলের পথে দ্রুত কেনাকাটার সুবিধা দেওয়া। অফিসে যাওয়ার আগে কফি বা নাশতা, ফেরার পথে প্রয়োজনীয় মুদি পণ্য, হঠাৎ দরকারি ঘরোয়া জিনিস—এই ধরনের চাহিদাকে কেন্দ্র করে তারা দোকান সাজাচ্ছে। পণ্যের তালিকায় রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য, হিমায়িত খাবার, মুদি পণ্য, ঘরোয়া সামগ্রী, স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য পণ্য, ক্যাফে পণ্য, প্রস্তুত খাবার এবং সাধারণ ওষুধজাত পণ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশন আউটলেটের তথ্যও এই নতুন মডেলের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। সেখানে প্রায় ৩০ ধরনের পণ্য রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিক্রি বেশি হয়। প্রথম সময়টিতে অফিসগামী, শিক্ষার্থী ও যাত্রীদের ভিড় থাকে; দ্বিতীয় সময়টিতে মানুষ বাড়ি ফেরার পথে কেনাকাটা করেন। ওই আউটলেটের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্রেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যা দেখায় যে অবস্থানভিত্তিক খুচরা ব্যবসা সঠিক জায়গায় করা গেলে দ্রুত নির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বড় সুপারস্টোর ব্র্যান্ডের সংখ্যা প্রায় ৩০টি। শুরুতে এই খাত মূলত বড় শহরভিত্তিক ছিল। কিন্তু এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের কারণে কিছু উপজেলা শহরেও সুপারস্টোর পৌঁছে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বপ্ন ও ডেইলি শপিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বড় শহরের বাইরে বাজার তৈরির চেষ্টা করছে। আয় বাড়া, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ক্রেতাদের মান-সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সম্প্রসারণ আরও বাড়তে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও আছে। সুপারস্টোর এখনো মোট বাজারের তুলনায় ছোট। বেশিরভাগ মানুষ কাঁচাবাজারের সঙ্গে বেশি পরিচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে সেখানে দাম কম মনে করেন। তাজা মাছ, শাকসবজি বা স্থানীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কাঁচাবাজার এখনো শক্তিশালী। আবার সুপারস্টোর চালাতে ভাড়া, বিদ্যুৎ, কর্মী, সরবরাহ ব্যবস্থা, পণ্য সংরক্ষণ ও প্রযুক্তি খরচ বেশি। ফলে ব্যবসা লাভজনক রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুব হিসাব করে এগোতে হবে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো বিশ্বাস। ক্রেতারা সুপারস্টোরে যান শুধু সুন্দর পরিবেশের জন্য নয়; তারা আশা করেন পণ্য আসল হবে, মেয়াদ ঠিক থাকবে, দাম স্বচ্ছ হবে এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এই বিশ্বাস ধরে রাখতে না পারলে বড় বিনিয়োগ বা বেশি আউটলেটও দীর্ঘমেয়াদে ফল দেবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের খুচরা বাজার এখন পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচাবাজারের ঐতিহ্য এখনো শক্তিশালী, কিন্তু শহুরে সময়সংকট, নিরাপদ পণ্যের চাহিদা, স্বচ্ছ দাম, বিদেশি বিনিয়োগ এবং মেট্রোরেলকেন্দ্রিক নতুন নগরজীবন সুপারস্টোর খাতকে নতুন গতি দিচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এই প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। যে প্রতিষ্ঠান ক্রেতার সময়, আস্থা, মান ও সুবিধাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে পারবে, তারাই বাংলাদেশের আধুনিক খুচরা বাজারে এগিয়ে থাকবে।

