নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমদানি ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি রপ্তানি আয়। একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ছাড় কমেছে, প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি বিদেশি বিনিয়োগও। ফলে বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি চলতি হিসাবেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের হিসাবে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এর ফলে কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে ৫৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে আমদানি বেড়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৩৬ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানই মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
তবে প্রবাসী আয় ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ২৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
চলতি হিসাবের ভারসাম্য বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্সেও ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-এপ্রিল সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিতে চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত থাকা সাধারণত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এতে নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনায় অতিরিক্ত ঋণের প্রয়োজন পড়ে না। বিপরীতে ঘাটতি দেখা দিলে তা পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। বর্তমানে দেশের চলতি হিসাব এখনও ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি হিসাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানি আয় কমে গেলে চলতি হিসাবের ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকির মাত্রাও বাড়তে পারে। কারণ বড় বাণিজ্য ঘাটতি এবং ঋণাত্মক চলতি হিসাব বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে অনিশ্চয়তার বার্তা দেয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশে ১৪৩ কোটি ডলার এফডিআই এসেছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ডলারে।
শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে নিট হিসাবে ১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল ১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
তবে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের হিসাবে কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ৬৫ কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল, সেখানে এবার উদ্বৃত্তে ফিরেছে হিসাবটি।
অন্যদিকে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতি, দুর্বল বিদেশি বিনিয়োগ এবং আর্থিক হিসাবের চাপ অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। তবে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

