ধোঁয়া, ছাই আর কাঠের জ্বালানির ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে দেশের লাখো পরিবারের রান্নাঘরে স্বস্তি এনেছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। বিশেষ করে আবাসিকে নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই জ্বালানি। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে চিত্র বদলে গেছে। সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজির বাজারে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং নতুন গ্রাহকদের আগ্রহও হ্রাস পাচ্ছে।
আজ বিশ্ব এলপিজি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘এলপিজি: পাস ইট ফরওয়ার্ড’ বা ‘সামনে এগিয়ে দাও’। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে আগামী প্রজন্মের কাছে এলপিজিকে আরও সহজলভ্য করে তোলার লক্ষ্য নিয়েই দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এলপিজির ব্যবহার ব্যয় কমানো জরুরি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, একসময় তুলনামূলক কম দাম এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছিল। কয়েক বছর ধরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশেরও বেশি ছিল। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে সেই গতি কমে এসেছে। পরিবারের মাসিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেকেই এলপিজি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াব মনে করে, কর ও শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করলে ভোক্তাদের জন্য পণ্যটি আরও সাশ্রয়ী করা সম্ভব। সংগঠনটির দাবি, সিলিন্ডার উৎপাদনের পর বটলিং প্ল্যান্টে নেওয়ার সময় আবারও ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে একই পণ্যের ওপর কার্যত দুই দফা শুল্কের বোঝা তৈরি হচ্ছে। তারা উৎপাদন পর্যায়ে শুল্ক অব্যাহতি এবং সিলিন্ডার তৈরির কাঁচামালের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
২০১৫ সালে আবাসিকে নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর এলপিজির বাজারে দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু হয়। লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০০ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে তা বেড়ে ১২৩ শতাংশে পৌঁছায়। বিশ্ববাজারে কম দাম এবং নতুন কোম্পানির প্রবেশে তখন সিলিন্ডার গ্যাস সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ৫ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা হলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা প্রায় ১৫ লাখ টনে উন্নীত হয়।
বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এর বড় অংশ ১২ কেজির সিলিন্ডার। ২০২০ সালে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯০০ টাকা। পরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মাসভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ শুরু করে। ২০২১ সালের এপ্রিলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯০৬ টাকা এবং মে মাসে তা কমে ৮৪২ টাকায় নেমে আসে। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়ে। গত ডিসেম্বরে সংকটের সময় কোথাও কোথাও গ্রাহকদের তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।
বর্তমানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৮৮৫ টাকা হলেও অনেক স্থানে ভোক্তাদের প্রায় দুই হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারীদের মাসিক ব্যয় তুলনামূলক কম। মিটারযুক্ত সংযোগে মাসে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং মিটারবিহীন সংযোগে ১ হাজার ৮০ টাকা খরচ হয়। বিপরীতে এলপিজিনির্ভর একটি ছোট পরিবারের মাসিক খরচ প্রায় তিন হাজার টাকায় পৌঁছায়।
এই বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার রান্নার জন্য বিদ্যুৎচালিত চুলার দিকে ঝুঁকছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
শহরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে। চায়ের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ নানা খাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার হার কমে গেছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এখন শিল্প ও পরিবহন খাতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
গত কয়েক বছরে দেশে এক হাজারের বেশি অটো গ্যাস স্টেশন চালু হয়েছে। তবে পরিবহন খাতেও এলপিজির ব্যবহার কিছুটা কমছে। যখন প্রতি লিটার এলপিজির দাম ৬০ টাকার মধ্যে ছিল, তখন অনেক গাড়ি এলপিজিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল। বর্তমানে লিটারপ্রতি দাম ৮৭ টাকায় পৌঁছানোয় সেই আগ্রহ আগের তুলনায় কমেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এলপিজির বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার রান্নার কাজে লাকড়ি, শুকনা গোবর ও অন্যান্য বায়োমাস জ্বালানি ব্যবহার করে। অন্যদিকে প্রায় ৪১ লাখ গ্রাহক প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়ণের বিস্তারের ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ এলপিজির দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে সক্ষমতা থাকা ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মাত্র ১৬টি এলপিজি আমদানি করে। বাজারের বেশির ভাগ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীদের মতে, এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। কারণ মূল্য বৃদ্ধি পেলে ভোক্তাদের আগ্রহ কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তাই বাজার সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

