দেশের শিল্প খাত এমন এক সময় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যখন বৈশ্বিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র, কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত শিল্পোদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হবে, বিনিয়োগের গতি কমবে এবং রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
শিল্পমালিকদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করেই মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজের সমস্যা চলমান থাকায় অনেক কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আগেই বেড়েছে। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে সেই চাপ আরও তীব্র হবে।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, কালুরঘাট, নাসিরাবাদ ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ডলার সংকট, ঋণপত্র খোলার জটিলতা, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে শিল্প খাত চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি যুক্ত হলে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও পণ্যের বিক্রয়মূল্য বা মুনাফার হার সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে অনেক কারখানার জন্য উৎপাদন অব্যাহত রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার শিল্প খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ শিল্প উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি সব ধরনের শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। সুতা, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, রড, সিমেন্ট, রাসায়নিক পণ্য, ভারী যন্ত্রাংশসহ প্রায় সব শিল্পেই এর প্রভাব পড়বে। ফলে শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের জন্য বেশি মূল্য পরিশোধ করলেও তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজ সমস্যার কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারী শিল্পে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন পুনরায় চালু করতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে উৎপাদন ক্ষতি যেমন বাড়ে, তেমনি ব্যবসার দক্ষতাও কমে যায়।
অনেক কারখানা বর্তমানে ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন সচল রাখছে। কিন্তু ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে এই বিকল্প ব্যবস্থাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পরিবর্তে দাম বাড়ানো হলে তা উৎপাদন ব্যয়কে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহকারীদের ওপর মূল্য কমানোর চাপ বাড়িয়েছেন।
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, একদিকে রপ্তানি আদেশের মূল্য কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে মুনাফার পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি খাতটির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ বিদেশি ক্রেতারা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত মূল্য দিতে আগ্রহী নন। ফলে বাড়তি ব্যয়ের পুরো বোঝা বহন করতে হবে উদ্যোক্তাদেরই।
ভারী শিল্প ও নির্মাণসামগ্রী খাতও একই ধরনের চাপে রয়েছে। রড, সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা বিরাজ করছে। আবাসন বাজারে ধীরগতি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বিক্রি আগের তুলনায় কমেছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল ও স্ক্র্যাপ লোহা আমদানির খরচ ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারী শিল্পগুলোতে বিদ্যুতের ব্যবহারও তুলনামূলক বেশি। ফলে নতুন মূল্যহার এই খাতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রড ও সিমেন্টের দামও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে আবাসন খাত ও উন্নয়ন প্রকল্পে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা—দুই সমস্যাই একসঙ্গে বিদ্যমান। এতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় যদি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলো নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পমালিকদের অভিমত, রাজস্ব ঘাটতি বা আর্থিক চাপ সামাল দিতে বারবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না। বরং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, অপচয় রোধ এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের দাবি, দেশের শিল্পায়নের গতি বজায় রাখা, রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয়ের নতুন চাপ বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

