মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপকরণ হেলমেটের আমদানি মূল্য ও বাজারদরের মধ্যে বিস্ময়কর ব্যবধানের তথ্য সামনে এসেছে। শুল্ক নথি অনুযায়ী, আমদানির সময় একটি হেলমেটের গড় মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র ৩ ডলার বা প্রায় ৩৭০ টাকা। অথচ একই ধরনের হেলমেট দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
এই বিশাল মূল্যপার্থক্য ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে আমদানি পর্যায়ে ঘোষিত দামের যথার্থতা নিয়ে। দেশীয় উৎপাদক ও বড় আমদানিকারকদের অভিযোগ, প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম দেখিয়ে হেলমেট আমদানি করা হচ্ছে। ফলে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাও ব্যাহত হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই হেলমেট আমদানিতে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা প্রকৃত দামের চেয়ে কম মূল্য ঘোষণা করার প্রবণতা রয়েছে। এতে শুল্ক ও কর কম পরিশোধ করা সম্ভব হয়। কিন্তু এর ফলে বাজারে পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে অসঙ্গতি তৈরি হয় এবং দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
শুল্ক বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৮ লাখ ৭৫ হাজার হেলমেট আমদানি হয়েছে। এসব পণ্যের বিপরীতে ঘোষিত মোট মূল্য ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি হেলমেটের গড় আমদানি মূল্য ৩ ডলারেরও কম। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যার মূল্য প্রায় ৩৭০ টাকা।
আমদানি হওয়া হেলমেটের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে ভারত থেকে। দেশটি থেকে ৬ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি হেলমেট আমদানি করা হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন, যেখান থেকে এসেছে ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি হেলমেট। এছাড়া ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান থেকেও সীমিত পরিসরে হেলমেট আমদানি হয়েছে।
শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় হেলমেটের গড় ঘোষিত মূল্য ৩ দশমিক ০২ ডলার। অন্যদিকে চীন থেকে আমদানি করা হেলমেটের গড় মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৯৬ ডলার। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে একটি হেলমেটের ঘোষিত আমদানি মূল্য ২৫০ টাকারও কম।
তবে বাস্তব বাজারচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের হেলমেট সাধারণত ১ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। মডেল, মান, ডিজাইন ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দাম আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে ভারতীয় কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ডের হেলমেট আমদানির সময় আড়াই থেকে ৩ ডলার মূল্য ঘোষণা করা হলেও বাজারে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দামে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃতপক্ষে আমদানি মূল্য এত কম নাকি কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে মূল্য কম দেখানো হচ্ছে।
দেশীয় হেলমেট উৎপাদকরা বলছেন, তারা কাঁচামাল আমদানি করে উৎপাদন করার পরও কম দামে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ অনেক আমদানিকারক কম মূল্য ঘোষণা করে শুল্ক সুবিধা নিচ্ছেন। এতে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারীরা অসুবিধায় পড়ছেন এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজস্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, হেলমেট আমদানিতে আন্ডার-ইনভয়েসিং এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি চালানের তথ্য এবং স্থানীয় বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি থাকলেও সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সহজ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু রাজস্ব হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হেলমেটের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। যদি নিম্নমানের পণ্য কম মূল্য দেখিয়ে আমদানি করা হয় এবং তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়, তাহলে ভোক্তারা প্রকৃত নিরাপত্তা সুবিধা না পেয়েও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনক। এমন পরিস্থিতিতে মানসম্মত হেলমেট সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, হেলমেট আমদানিতে ঘোষিত মূল্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ চালানগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে এবং ভোক্তারাও মানসম্মত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।

