দেশের ঐতিহ্যবাহী চিনিশিল্প এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলো ঘিরে শ্রমিক ও আখচাষিদের দীর্ঘ হতাশা, অন্যদিকে আবার চালুর ঘোষণা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতির অভাব—সব মিলিয়ে এই খাতকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা।
২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর ২১টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বন্ধ হওয়া মিলগুলো হলো শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় এবং রংপুর চিনিকল। দীর্ঘদিন লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আধুনিকায়নের অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়।
বন্ধের পর থেকেই শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিরা নিয়মিতভাবে আন্দোলন ও দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করা বিভিন্ন সংগঠনও দেশীয় চিনিশিল্প রক্ষার পক্ষে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বন্ধ চিনিকল চালুর জন্য একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি নতুন জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত দেয়। একই বছরের ডিসেম্বরে ধাপে ধাপে মিলগুলো চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এরপর ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন বন্ধ থাকা মিলগুলোর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে সেতাবগঞ্জ ও শ্যামপুর চিনিকল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে সেতাবগঞ্জের জন্য ৮২৩ কোটি টাকা এবং শ্যামপুরের জন্য ৫৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় একাধিকবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিলেও বরাদ্দ অনুমোদন মেলেনি। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতেও একই অনুরোধ জানানো হলেও আবারও তা নাকচ হয়ে যায়। ফলে টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি থমকে আছে। অর্থ ছাড় না থাকায় মিলগুলো কাগজে-কলমে চালুর সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবে সেতাবগঞ্জ ও শ্যামপুর এখনো বন্ধই রয়ে গেছে। বাকি চারটি মিল কবে চালু হবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারছে না। এতে শ্রমিক, আখচাষি, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশীয় চিনিশিল্প আবারও স্থবিরতার দিকে ফিরে যাচ্ছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (চিনিশিল্প) জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২০২০ সালের পর বহু চিনি কারখানা বন্ধ হয়েছে মূলত আখ চাষ কমে যাওয়া এবং পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে। তাঁর মতে, এসব মিল পুনরায় চালু করতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন, যার ব্যয় অত্যন্ত বেশি। শুধু নতুন মেশিনের জন্যই প্রায় হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আখ চাষ ছাড়া চিনিকল সচল রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানে কৃষকেরা লোকসানের কারণে আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাই শুধু মিল চালু করলেই হবে না, আখ উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা এবং কৃষি খাতের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে দেশীয়ভাবে চিনি উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলেও তিনি জানান। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভারত ও ব্রাজিল থেকে অপরিশোধিত চিনি এনে দেশে প্যাকেটজাত করা হয়।
এদিকে বন্ধ মিলগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়েও চিন্তা চলছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু চীনা বিনিয়োগকারী বন্ধ মিলগুলো পরিদর্শন করেছেন। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো জনবল। ২০১২ সালের পর থেকে নতুন করে কোনো নিয়োগ হয়নি। ২০২০ সালে ছয়টি মিল বন্ধ হওয়ার পর সেখানকার কর্মীদের সচল মিলগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সব মিল ও বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনে প্রায় ৬ হাজার জনবল রয়েছে, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ১৭ হাজার। ফলে নতুন করে মিল চালু করতে হলে বড় পরিসরে নিয়োগ দিতে হবে।
সব মিলিয়ে অর্থায়ন, আখ উৎপাদন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং জনবল—এই চারটি বড় সংকট চিনিশিল্পকে এখনো অচলাবস্থার মধ্যে রেখেছে। ফলে একসময় দেশের অন্যতম শক্তিশালী এই শিল্প খাত এখন ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে।

