দেশের ফল রপ্তানি খাতে চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ওপর ভর করে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই এ খাত থেকে আয় পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়। একই সঙ্গে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে কৃষিভিত্তিক এ খাত।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ফল রপ্তানি করে আয় করেছে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮০ শতাংশেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশীয় ফলের প্রতি বাড়তি আগ্রহ। বিশেষ করে আম, পেয়ার, কাঁঠাল, আনারস ও লিচুর চাহিদা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রপ্তানিকারকরা জানান, গ্রীষ্ম মৌসুমে আম এখনো দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের মধ্যে দেশীয় আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
তাদের মতে, উন্নত মান বজায় রেখে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পেয়ার ও কাঁঠালও দ্রুত জনপ্রিয় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হচ্ছে। পাশাপাশি আনারস, কলা ও অন্যান্য মৌসুমি ফলও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান করে নিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, রপ্তানির বড় অংশ এসেছে তাজা ও শুকনো ফল এবং বাদামজাত পণ্য থেকে। এই খাতে আয় এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে হিমায়িত ফল ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানিও সামান্য হলেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের ফল রপ্তানির এই অগ্রগতি শুধু প্রবাসী চাহিদার কারণে নয়, বরং কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য ও গুণগত মান বৃদ্ধির ফলও বটে। পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফির মতো নতুন ফসলের চাষ সম্প্রসারণও এ খাতকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে এখনো বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং এবং ব্র্যান্ডিংয়ে পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশ এখনো মূলধারার ফল রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
রপ্তানিকারকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো লজিস্টিকস সংকট। উচ্চ বিমান ভাড়া, সীমিত কার্গো সুবিধা, পর্যাপ্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব এবং শুল্ক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রপ্তানি বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, জেলা থেকে আম রপ্তানির পরিমাণ প্রতি বছর বাড়লেও পরিবহন ব্যয় এবং কেন্দ্রীয়কৃত সেবা ব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তারা চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাদের মতে, বিভাগীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় রপ্তানি সেবা নিশ্চিত করা গেলে খরচ কমে আসবে এবং রপ্তানির গতি আরও বাড়বে।
অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষিপণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, ফসল-পরবর্তী সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্যাকিং শেডের মতো অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে এই খাত থেকে আয় আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফল রপ্তানির এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। কারণ এ খাত মূলত দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে আমদানি ব্যয়ের চাপ তুলনামূলকভাবে কম।
সব মিলিয়ে প্রবাসী চাহিদা, কৃষি উৎপাদনের বৈচিত্র্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে আগামী বছরগুলোতে ফল রপ্তানি বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

