রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাব খাওয়ার পরিচিত অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে একটি দেশীয় উদ্যোগ। থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় মডেল অনুসরণ করে প্রক্রিয়াজাত ডাব বাজারজাত করে গ্রাহকদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘কোকো গ্রিন’। কয়েক বছর আগেও যে ধারণাটি দেশের বাজারে প্রায় অপরিচিত ছিল, সেটিই এখন নগরজীবনের ব্যস্ত মানুষের জন্য একটি সুবিধাজনক পণ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ রোগী, কর্মব্যস্ত চাকরিজীবী কিংবা স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের জন্য ডাব খাওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এটি বহন ও কাটার ঝামেলা। সেই সমস্যার সমাধান করতেই প্রক্রিয়াজাত ডাব নিয়ে বাজারে আসে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে রাজধানীর হাজারো পরিবার নিয়মিত এই সেবা গ্রহণ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল দুই বন্ধুর একটি সাধারণ ব্যবসায়িক ভাবনা থেকে। অনলাইনভিত্তিক নতুন ধরনের কোনো পণ্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা থেকেই তারা প্রক্রিয়াজাত ডাবের ধারণা নিয়ে এগিয়ে যান। শুরুতে বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পরীক্ষামূলক প্রচারণা তাদের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস জোগায়।
প্রথমদিকে হাতে গোনা কয়েকটি অর্ডার নিয়ে কাজ শুরু হলেও ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। নতুন ধরনের এই পণ্য সম্পর্কে মানুষের নানা প্রশ্ন ছিল। অনেকেই জানতে চাইতেন, বাইরের খোসা সরিয়ে ফেলার পর ডাব কতদিন সতেজ থাকে, পানির মান ঠিক থাকে কি না কিংবা স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসে কি না। কিন্তু নিয়মিত গ্রাহকদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের কারণে এসব সংশয় ধীরে ধীরে দূর হয়ে যায়।
প্রক্রিয়াজাত ডাব মূলত এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যাতে গ্রাহককে আর দা বা ধারালো কোনো যন্ত্র ব্যবহার করতে না হয়। বাইরের মোটা আবরণ সরিয়ে ডাবকে বিশেষভাবে পরিষ্কার ও প্যাকেটজাত করা হয়। পরে একটি বিশেষ সরঞ্জামের সাহায্যে সহজেই ডাবের পানি পান করা যায়। ফলে বাসা, অফিস, হাসপাতাল কিংবা জিম—যেকোনো স্থানে এটি ব্যবহার করা সম্ভব।
প্রতিষ্ঠানটির ডাব সংগ্রহের বড় অংশ আসে ভোলা অঞ্চল থেকে। স্থানীয় বাগান মালিকদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে ডাব সংগ্রহ করা হয়। পরে রাজধানীতে এনে সেগুলো মান যাচাই, শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রক্রিয়াজাত করার কাজ সম্পন্ন করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতেই তারা সরাসরি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পুরো চেইন নিজেদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করছে। এতে প্রতিটি ডাবের আকার, পানির পরিমাণ এবং স্বাদ যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১,০০০টি ডাব বিক্রি হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে দিনে ১০ থেকে ১৫টি ডাব বিক্রি হতো, সেখানে এখন চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পরিবার ছাড়াও হাসপাতাল, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও ফিটনেস সেন্টারগুলোর মধ্যেও এই পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটি শুধু ডাবের পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ডাবের শাঁস, ডাবের পুডিং, নারকেল দুধ, নারকেলভিত্তিক মিষ্টিজাত পণ্য এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যও বাজারজাত করছে। এর ফলে একই কাঁচামাল থেকে বহুমুখী মূল্য সংযোজন সম্ভব হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। অনলাইন ব্যবসায় একটি পণ্যের মান নিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা পুরো ব্র্যান্ডের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এজন্য প্রতিটি ডাবের গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মাসিক বিক্রয় আয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে। সীমিত পুঁজি ও একটি ছোট ভাড়া করা কক্ষ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন কয়েকজন কর্মীর কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে।
তবে উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য আরও বড়। তারা ভবিষ্যতে সারা দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি ডাবের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব জৈব উপাদান উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে যেসব খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দিতে হয়, সেগুলো ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন কৃষি উপকরণ তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
দেশে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং সুবিধাভিত্তিক খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত ডাবের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, আধুনিক প্যাকেজিং, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করা গেলে এই খাত ভবিষ্যতে আরও বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।
একসময় যে ডাব কিনতে হলে বাজারে যেতে হতো, এখন সেটিই কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে বাসার দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়েই একটি ছোট উদ্যোগ ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে নিজস্ব বাজার ও নতুন সম্ভাবনার গল্প।

