দেশের মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে ২০২৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দেখা গেছে। বাজারের শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোনের আয় ও মুনাফা কমেছে, অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী রবি আজিয়াটার আয় ও মুনাফা উভয়ই বেড়েছে। একই শিল্পে কাজ করেও দুই প্রতিষ্ঠানের এমন ভিন্ন ফলাফলের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, গ্রাহকসংখ্যার পরিবর্তন দুই কোম্পানির আর্থিক ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষে গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহকসংখ্যা সামান্য কমে ৮ কোটি ৩৯ লাখে নেমে আসে। বিপরীতে রবির সক্রিয় গ্রাহক বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৭৪ লাখে। গ্রাহক কমে যাওয়ায় গ্রামীণফোনের রাজস্ব প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে, আর গ্রাহক বৃদ্ধি রবির আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এর অন্যতম কারণ ছিল সিম নিবন্ধন নীতির পরিবর্তন। জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সিম নিবন্ধনের সর্বোচ্চ সীমা ১৫ থেকে ১০-এ নামিয়ে আনার ফলে অতিরিক্ত সিম নিষ্ক্রিয় করতে হয়। বাজারে সবচেয়ে বড় অংশীদার হওয়ায় গ্রামীণফোন এ সিদ্ধান্তের প্রভাব বেশি অনুভব করেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ কারণে প্রায় ১০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহক হারাতে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ডেটা ব্যবহারের প্রবণতা রবির পক্ষে কাজ করেছে। বর্তমানে টেলিকম খাতের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হচ্ছে মোবাইল ইন্টারনেট। রবির মোট গ্রাহকের প্রায় ৭৭.৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, যা গ্রামীণফোনের ৫৮ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে ডেটা-নির্ভর আয়ের সুযোগ রবি বেশি কাজে লাগাতে পেরেছে।
তৃতীয়ত, গ্রাহকপ্রতি গড় আয় বা এআরপিইউ (Average Revenue Per User)-এর ক্ষেত্রেও দুই কোম্পানির মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। গ্রামীণফোনে এই আয় ১৫৫ টাকা থেকে কমে ১৫১ টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে রবির ক্ষেত্রে তা বেড়ে প্রায় ১৪৬ টাকায় পৌঁছেছে। ডেটা প্যাকেজ ও সেবার ব্যবহার বৃদ্ধি রবির এ আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
ভয়েস কলের ব্যবহার কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ। দুই অপারেটরের ক্ষেত্রেই গ্রাহকরা আগের তুলনায় কম কথা বলছেন। এর পেছনে রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি। তবে গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে ভয়েস কল কমার হার তুলনামূলক বেশি ছিল, যা তাদের রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গ্রাহকদের ব্যয় করার সক্ষমতা কমেছে। অনেক গ্রাহক মোবাইল খরচ সীমিত করেছেন, যা বিশেষ করে গ্রামীণফোনের মতো প্রিমিয়াম গ্রাহকভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছে।
তবে আয় ও মুনাফা কমলেও আর্থিক সক্ষমতার বিচারে গ্রামীণফোন এখনো অনেক এগিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার হার প্রায় ১৮.৭ শতাংশ, যেখানে রবির ৯.৪ শতাংশ। একইভাবে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগের ওপর রিটার্ন এবং নিট সম্পদমূল্যের ক্ষেত্রেও গ্রামীণফোনের অবস্থান শক্তিশালী।
বিশ্লেষকদের মতে, রবি বর্তমানে ডেটা-নির্ভর প্রবৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামীণফোন স্বল্পমেয়াদে কিছু চাপের মুখে পড়লেও তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, বড় গ্রাহকভিত্তি এবং উচ্চ মুনাফা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে দুই প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের পার্থক্যের মূল কারণ ছিল গ্রাহকসংখ্যার পরিবর্তন, ডেটা ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি, সিম নিবন্ধন নীতির প্রভাব এবং গ্রাহকপ্রতি আয় বৃদ্ধির সক্ষমতা। তবে বাজারের সবচেয়ে লাভজনক অপারেটর হিসেবে গ্রামীণফোন এখনো তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে।

