দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষা শেষে চট্টগ্রামে প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হতে যাচ্ছে। নানা প্রশাসনিক জটিলতা, মালিকানা বিতর্ক এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর অবশেষে প্রায় ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে আজ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনুমোদন মিললে এটি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকায় প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর সরকারিভাবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি অন্তত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত। মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। বাকি প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা আসবে চীনের আর্থিক সহায়তা থেকে। ফলে এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায় এবং দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। একই বছরে জমি অধিগ্রহণও সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এরপর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
প্রথমদিকে অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে বিভিন্ন কারণে সেই চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসায় প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। কয়েক বছর ধরে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় অনেকেই এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ২০২২ সালে। তখন চীনের পক্ষ থেকে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করা হয়। পরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ও চীনা অংশীদারের যৌথ মালিকানায় একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। জমির দীর্ঘমেয়াদি লিজ মূল্য এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের ভিত্তিতে দুই পক্ষের মালিকানা কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে বহুদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রকল্পটি আবার সক্রিয় আলোচনায় ফিরে আসে।
প্রকল্পের আওতায় শুধু শিল্পকারখানার জন্য জমি প্রস্তুত করা হবে না, বরং সম্পূর্ণ শিল্পাঞ্চল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, প্রশস্ত সড়ক, গ্যাস সংযোগ, সীমানাপ্রাচীর, জেটি, পানি সংরক্ষণাগার এবং বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা যাতে দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের মৌলিক সুবিধা আগে থেকেই নিশ্চিত করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে দেশের শিল্পায়নে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বিশেষ করে চীনের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান এখানে কারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। চামড়া, হালকা প্রকৌশল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রাসায়নিক শিল্প, ইলেকট্রনিক পণ্য, জুতা এবং ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আগ্রহের কথা ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি আরও বহুমুখী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে যদি বিভিন্ন ধরনের শিল্প স্থাপিত হয়, তাহলে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে। এতে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও কমবে।
তবে সুযোগের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এত বড় শিল্পাঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য সেবার চাহিদা মেটাতে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিদ্যমান সংকটের মধ্যে নতুন শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা একটি বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন থেকে বাংলাদেশে নতুন ঋণ ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এমন প্রেক্ষাপটে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মী যুক্ত হচ্ছে। তাদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়, তাহলে তা শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের আগে প্রকল্পটির অনুমোদন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ বড় আকারের শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে গতি আনছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুমোদন পেলে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

