জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামাল বাংলাদেশ আমদানি করছে কি না, তা যাচাই করতে চলতি মাসেই ঢাকায় আসছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষজ্ঞ দল। সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ঝুঁকি, শ্রমমান এবং আমদানি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা মূল্যায়নে এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী ২১ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের উদ্যোগে একটি গবেষণা ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সফরকালে প্রতিনিধি দল সরকারি দপ্তর, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে তথ্য সংগ্রহ করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই সফর নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামাল সরবরাহ চেইনে ব্যবহৃত হলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই বিভিন্ন দেশের আমদানি ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর তারা বিশেষ নজরদারি বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য প্রতিশ্রুতিতে যুক্ত হয়েছে, তার বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও এই সফরে মূল্যায়ন করা হবে। বিশেষ করে শ্রম অধিকার, সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা, আমদানি উৎসের গ্রহণযোগ্যতা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
এ মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইসিএফ। প্রতিনিধি দলে গবেষক, শ্রম বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থাকবেন। তারা সরকারি সংস্থা ছাড়াও ব্যবসায়ী ও শ্রম খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক মাধ্যমে সফরের বিষয়টি আগে থেকেই বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সফর সফল করতে বাণিজ্য, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বাণিজ্য খাতের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তাদের দাবি, বাংলাদেশ এমন কোনো উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানি করে না, যেখানে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কাছ থেকেও একই ধরনের আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সরাসরি আমদানির বিষয় নয়, বরং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল কতটা স্বচ্ছ এবং যাচাইযোগ্য, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। উন্নত দেশগুলো ক্রমেই মানবাধিকার, শ্রমমান এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই মূল্যায়ন বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সুযোগও বটে। কারণ এর মাধ্যমে দেশের শ্রম আইন প্রয়োগ, কারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কতটা কার্যকর, তা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সমঝোতায় শ্রম অধিকার সুরক্ষা এবং জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধের বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। এসব অঙ্গীকারের আওতায় শ্রম পরিদর্শকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মস্থলে আকস্মিক পরিদর্শন এবং শিশু শ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাধ্যতামূলক শ্রম, কারাবন্দি শ্রম কিংবা জোরপূর্বক শিশুশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার বিষয়েও বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে আসন্ন সফর শুধু একটি গবেষণা কার্যক্রম নয়, বরং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, শ্রমমান এবং ভবিষ্যৎ বাজার প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের ফলাফল ইতিবাচক হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য এটি একটি স্বস্তির বার্তা হবে। তবে কোনো ধরনের দুর্বলতা চিহ্নিত হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক চাপ, অতিরিক্ত শুল্ক কিংবা বাজার প্রবেশে নতুন শর্তের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এই মূল্যায়নকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার ও ব্যবসায়ী মহল।

