মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হওয়ায় চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে গ্যাস খাতে ভর্তুকি ব্যয় তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও সার খাতেও ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত বাজেটে শুধু গ্যাস খাতেই বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মে মাস পর্যন্ত এই খাতে ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করায় এই ব্যয় দ্রুত বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাসের বৈশ্বিক মূল্যও অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে তুলনামূলক কম দামের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে সরবরাহ নিতে হচ্ছে, যা ভর্তুকি ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে মোট ৩৮টি কার্গো এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ ডলার, যেখানে যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ৯ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে।
শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুৎ ও সার খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও সার মিলিয়ে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতেই রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। কয়েক বছর আগেও এই দুই খাতে ভর্তুকি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম, যা এখন কয়েকগুণ বেড়ে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও সারের মূল্য সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়ে আসছে, যাতে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানো যায়।
তবে সরকার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে সারের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিদ্যুতের দাম কিছুটা সমন্বয় করা হলেও সার খাতে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়ের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।
বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ভর্তুকি ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাঠামোগত ব্যয় কমানো ছাড়া ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তবে চুক্তি পরিবর্তন বা পুনঃআলোচনা আইনগত ও আর্থিক জটিলতার কারণে সহজ নয়।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, বিতরণ ব্যবস্থায় অপচয় কমানো এবং ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা গেলে সীমিত হলেও সাশ্রয় সম্ভব। তবে মোট ব্যয়ের তুলনায় এই সাশ্রয় খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।
এদিকে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় খাতেও বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যয় উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। যদিও রপ্তানি প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনা ছিল, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে যাওয়ায় তা আপাতত অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে আগামী দিনগুলোতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে মূল্য স্থিতিশীল রাখা, অন্যদিকে রাজস্ব ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।

