দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ ও গতিশীল করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে চালু করা হবে অস্থায়ী বা প্রভিশনাল লাইসেন্স ব্যবস্থা। একই সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরের সেবা এক জায়গা থেকে পাওয়ার জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে কেন্দ্রীয় অনলাইনভিত্তিক ‘ওয়ান-স্টপ উইন্ডো’ প্ল্যাটফর্ম।
গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই)-এর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জেবিসিসিআই সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন কমিয়ে আনতেই সমন্বিত অনলাইন সেবা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সেবাগুলো এক জায়গা থেকেই গ্রহণ করা যাবে।
তিনি জানান, শিল্পকারখানা বা অন্যান্য ভৌত স্থাপনার অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয় যাচাই করতে হয়। ফলে সব ধরনের অনুমোদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা সবসময় সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনের পরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
তবে অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে যাতে বিনিয়োগ কার্যক্রম আটকে না যায়, সে জন্য প্রভিশনাল লাইসেন্স চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার সুযোগ পাবেন।
অনুমোদনের সময়সীমা কমিয়ে আনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে একটি রূপরেখা তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন খাতের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলছে। কারণ প্রতিটি শিল্পখাতের প্রয়োজনীয়তা ও অনুমোদনের ধরন এক নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং একটি বস্ত্রশিল্প কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন।
কারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর ও সমন্বিত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিদর্শন কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে। বিডা পরিদর্শনের সময়সূচি নির্ধারণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করে একবারেই পরিদর্শন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করবে। এতে বিনিয়োগকারীদের বারবার বিভিন্ন সংস্থার কাছে যেতে হবে না।
বৈদ্যুতিক যানবাহন নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে আরও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার দিকে এগোতে চায়। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট প্রমাণ করেছে যে ডিজেল ও পেট্রোলিয়ামভিত্তিক জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ব্যয়বহুল এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে আগ্রহী। এ বিষয়ে মন্ত্রিসভারও ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে বর্তমান অবকাঠামোগত বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই আপাতত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির আমদানি ও ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বৈঠকে জেবিসিসিআই প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার সরলীকরণ এবং টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাপানকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও স্বচ্ছ, সহজ ও কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে যেখানে বিনিয়োগকারীরা অনলাইনে একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। সময়, ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
সভায় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রশংসাও করেন জেবিসিসিআই নেতারা। তাদের মতে, এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

