দীর্ঘ সাত বছর পর আবারও চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে বর্তমান ৬২ নটিক্যাল মাইল জলসীমার সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ নটিক্যাল মাইল যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বন্দরের জলসীমা উত্তর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হয়ে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এর ফলে মোট জলসীমা দাঁড়াবে ৭২ নটিক্যাল মাইল। বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাপানের ওসাকা ও কোবে বন্দরের মডেল অনুসরণ করে এই সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় সমুদ্রসীমায় নিরাপদ জাহাজ চলাচল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চার শতাব্দীরও বেশি পুরোনো চট্টগ্রাম বন্দর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার সময় এর জলসীমা ছিল মাত্র ৬ নটিক্যাল মাইল। পরে ২০১১ সালে আরও ৬ নটিক্যাল মাইল বাড়িয়ে আলফা, ব্রেভো ও চার্লি নামে তিনটি অ্যাংকরেজ এলাকা নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি পর্যন্ত ৫০ নটিক্যাল মাইল সম্প্রসারণের মাধ্যমে বন্দরের জলসীমা ৬২ নটিক্যাল মাইলে উন্নীত করা হয়।
নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সীতাকুণ্ড উপকূলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডও বন্দরের আওতায় চলে আসবে। পাশাপাশি শুধু জলসীমা নয়, অ্যাংকরেজ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বহির্নোঙরে আলফা ও চার্লি অ্যাংকরেজ ব্যবহৃত হলেও নতুন পরিকল্পনায় সন্দ্বীপ চ্যানেলকে কেন্দ্র করে নতুন একটি নোঙর এলাকা গড়ে তোলা হবে। এর নাম রাখা হয়েছে ‘এস (সন্দ্বীপ) অ্যাংকরেজ’।
বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, নতুন অ্যাংকরেজ চালু হলে কর্ণফুলী মোহনা ও পতেঙ্গা উপকূলে দীর্ঘদিন ধরে থাকা লাইটারেজ জাহাজের চাপ কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নদীপথে জাহাজজট হ্রাস এবং নৌ চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
জলসীমা সম্প্রসারণের এই উদ্যোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছে পতেঙ্গা উপকূলে নির্মাণাধীন বে টার্মিনাল প্রকল্প। দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত এই টার্মিনাল চালু হলে বড় আকারের কনটেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। অন্যদিকে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরও ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলসীমা আরও ১০ নটিক্যাল মাইল বাড়ানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা সহজ হবে। পাশাপাশি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্প কার্যক্রম ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
এই সম্প্রসারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব আয়। বন্দরের নির্ধারিত জলসীমায় প্রবেশকারী বা অবস্থানকারী জাহাজ থেকে মেরিন চার্জ, পোর্ট ডিউসসহ বিভিন্ন ফি আদায় করা হয়। এসব খাত থেকে বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্প এবং মিরসরাইয়ের সামুদ্রিক লজিস্টিক কার্যক্রম বন্দরের আওতায় এলে এই আয় আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছে। ফলে কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে সমুদ্রপথের ব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে।
বর্তমানে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয় এবং এর বড় অংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বন্দরের জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটি টার্মিনালে বছরে ৩২ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। পাশাপাশি চাল, গম, সিমেন্ট ক্লিংকার ও স্ক্র্যাপ লোহাবাহী মাদার ভেসেলগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে।
প্রতিবছর চার হাজারের বেশি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। চলতি অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ৩৫ লাখ টিইইউএস ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটেই জলসীমা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, নদীর গভীরতা ও নাব্যতার বিষয় বিবেচনায় রেখেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়িত হলে বন্দরের জলসীমা ৭২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
তবে শুধু জলসীমা বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম। তার মতে, সম্প্রসারিত এলাকায় নিয়মিত ড্রেজিং, বয়া স্থাপন এবং নিরাপদ নৌ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, সম্প্রসারিত এলাকায় পর্যাপ্ত নৌ নির্দেশনা ব্যবস্থা, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং জোন, সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং গভীর সমুদ্রের বাণিজ্যিক রুটে জাহাজ চলাচল বাড়লে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ কারণে নৌবাহিনীর পাশাপাশি কোস্টগার্ডের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, ড্রোন, দ্রুতগতির টহল জাহাজ এবং আকাশপথে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি বলে মত দিয়েছেন তারা।
কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিস্তৃত জলসীমায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দ্রুতগতির জলযান, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের এক শীর্ষ কর্মকর্তার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বর্তমানে ৬২ নটিক্যাল মাইল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অতিরিক্ত ১০ নটিক্যাল মাইল যুক্ত হলেও নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের বিদ্যমান সক্ষমতায় তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহৎ সামুদ্রিক কার্যক্রম অঞ্চলে পরিণত হবে চট্টগ্রাম বন্দর। তবে এত বড় জলসীমায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রত্যাশিত সেবা প্রদান করাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা।

