এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য আমদানিতে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন ঘটেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এ খাতে আমদানি বেড়েছে ৫৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ফলে দেশটি থেকে কৃষিপণ্য আমদানিতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ ৭৭৪ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য আমদানি করেছিল। ২০২৫ সালে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৩৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৫ টাকা ধরে)।
গত এক দশকে এটিই যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড। এর আগে ২০১৮ সালে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২০ সালে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করা হয়েছিল। ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য আমদানি গড়ে বছরে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে। আমদানির শীর্ষ তালিকায় রয়েছে সয়াবিন, তুলা, গম, চাল, ভুট্টা, সয়াবিন মিল এবং উদ্ভিজ্জ তেল।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪৯০ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে ২০২৫ সালে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে, যা ১৪৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ৭৫৩ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে ৯২৮ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালে ৯২২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য আমদানি করা হয়েছিল।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে সয়াবিন আমদানিতে। ইউএসডিএর হিসাবে, এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে যেখানে সয়াবিন আমদানির ব্যয় ছিল ৩৪৮ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬০৩ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন টন সয়াবিন আমদানি করা হয়েছে।
গম আমদানিতেও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। এক বছরের ব্যবধানে এ পণ্যের আমদানি বেড়েছে ২৪১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৩৩ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলারে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ৫ লাখ ৬ হাজার ৭৬০ টন গম আমদানি করা হয়েছে। গত এক দশকে দেশটি থেকে গম আমদানি বেড়েছে ৫৩২ শতাংশ।
পশুখাদ্যে ব্যবহৃত সয়াবিন মিল আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ২০ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ২০২৫ সালে এ পণ্যের আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১০৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪০৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
চাল আমদানির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ৩ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করা হলেও ২০২৫ সালে তা প্রায় ৯৩৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ওই বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪৭ হাজার ৮৩৪ টন চাল আমদানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো ভুট্টা আমদানি করা হয়নি। তবে ২০২৫ সালে দেশটি থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ১৬৭ টন ভুট্টা আমদানি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৩৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন বা ৩ দশমিক ৫৮ কোটি ডলার। একই সময়ে সয়াবিন ছাড়া অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল আমদানি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের ৩ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি।
কৃষি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবেই দেশটি থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বেড়েছে। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিজাত পণ্য ও কৃষিপণ্যের কাঁচামাল আমদানির বাধ্যবাধকতা এবং মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার আরও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বছরে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল আমদানির কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তির ফলে দেশটি থেকে কৃষিজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে। তবে চুক্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানির শর্ত রয়েছে এবং দামও তারা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ফলে দরপত্রের মাধ্যমে কম দামে অন্য উৎস থেকে পণ্য কেনার সুযোগ বাংলাদেশ পাচ্ছে না। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং এটি একটি অসম চুক্তির ফল।
তিনি আরও বলেন, একজন ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ দরদাম করে পণ্য কিনতে পারবে না। এমনকি রাশিয়ার মতো দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা বাংলাদেশের জন্য অসম্মানজনক। এসব শর্ত জাতীয় সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত এবং প্রয়োজন হলে চুক্তি বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তাঁর মতে, এ চুক্তি দেশের কৃষি খাতের জন্য ইতিবাচক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

