প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া প্রত্যাহার করা হয়েছে—সম্প্রতি এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও বাস্তবে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এবং গ্রাহকদের তথ্য অনুযায়ী, আগের নিয়মেই প্রিপেইড মিটারের মাসিক ভাড়া কাটা হচ্ছে। ফলে ভাড়া বাতিলের খবরটি কার্যত গুজব বা ভুল তথ্য বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
দেশজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহক প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহার করছেন। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, একফেজ প্রিপেইড মিটারের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং তিনফেজ মিটারের জন্য ৪২ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এছাড়া সংযোগের সক্ষমতা অনুযায়ী আলাদা ডিমান্ড চার্জও পরিশোধ করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই দুটি খরচ নিয়ে অনেক গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
গত ৩ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক বার্তায় দাবি করা হয়, সরকার প্রিপেইড মিটারের মাসিক ভাড়া তুলে দিচ্ছে। তবে পরে বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের বিল ও রিচার্জ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের মতোই মিটার ভাড়া কাটা হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকরাও জানিয়েছেন, তাঁদের রিচার্জ থেকে নিয়মিতভাবে মিটার ভাড়ার অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, প্রিপেইড মিটারের ভাড়া প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো আবেদন কমিশনের কাছে জমা পড়েনি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে কমিশনও কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেয়নি। অর্থাৎ বিদ্যমান নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, প্রিপেইড মিটার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা মিটার ভাড়ার একটি অংশ সেই ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই হঠাৎ করে মিটার ভাড়া বাতিল করা হলে প্রকল্পের অর্থায়ন এবং ঋণ পরিশোধের বিষয়ে নতুন সমাধান প্রয়োজন হবে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের মূল্য, মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং কর—সবকিছু একটি সমন্বিত আর্থিক কাঠামোর আওতায় নির্ধারিত। এর মধ্যে একটি খাত বাতিল করলে সেই অর্থ অন্য কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে অথবা সরকারকে সরাসরি আর্থিক দায় বহন করতে হবে।
হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৫ লাখ প্রিপেইড গ্রাহক যদি সবাই একফেজ সংযোগ ব্যবহারকারীও হন, তাহলে শুধু মিটার ভাড়া থেকেই প্রতি মাসে প্রায় ২২ কোটি টাকা আদায় হয়। বছরে এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ২৬৪ কোটি টাকায়। ফলে এই রাজস্ব বন্ধ হলে সরকার বা বিতরণ কোম্পানির জন্য বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন হবে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রিপেইড মিটার প্রকল্প ২০১৭ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। সেই নীতিমালায় পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত মিটার ভাড়া আদায় বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, সরকার চাইলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে এই ভাড়া প্রত্যাহার করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের আর্থিক দায়ও সরকারকে বহন করতে হবে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ বিলসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে তা সরকারি প্রজ্ঞাপন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক আদেশের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সরকারি ঘোষণা যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের মধ্যে ভুল প্রত্যাশাও সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে গুজব ছড়ালে তা শুধু সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্তই করে না, বরং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও ভুল ধারণা তৈরি করে। তাই এ ধরনের তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

