দেশে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমন মৌসুমে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ধান উৎপাদন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের বীজের ব্যবহার এবং সুষম সার প্রয়োগের ফলে এ মৌসুমে মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ টন আমন ধান উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের কৃষি খাতের জন্য নতুন মাইলফলক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ উৎপাদন হিসাব অনুযায়ী, এবার ৫৭ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রতি হেক্টরে উৎপাদনও বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরের তুলনায় আমন ধানের উৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এক বছর আগে যেখানে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টন, সেখানে এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ টনে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ উচ্চফলনশীল (এইচওয়াইভি) ও হাইব্রিড জাতের ধানের চাষ বাড়ানো। চলতি অর্থবছরে উচ্চফলনশীল জাতের আবাদ বেড়ে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে হাইব্রিড ধানের আবাদও ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লাখ ৬২ হাজার হেক্টরে উন্নীত হয়েছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় ও ছিটিয়ে বপন করা প্রচলিত জাতের ধানের আবাদ কিছুটা কমেছে। ফলে কৃষকরা অধিক ফলনশীল জাতের দিকে ঝুঁকেছেন, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিবিএসের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত বীজের সহজলভ্যতা এবং সময়মতো সার প্রয়োগের কারণে কৃষকরা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলন পেয়েছেন। এসব কারণে দেশের অন্যতম প্রধান মৌসুমের ধানে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশে বছরে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে আমন মৌসুম থেকে। ফলে এ মৌসুমে উৎপাদনের এই প্রবৃদ্ধি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন কৃষি বিশ্লেষকরা।
চলতি অর্থবছরে আউশ ধানের উৎপাদন কিছুটা কমলেও আমনের রেকর্ড ফলন সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করেছে। আবাদি জমি ও ফলন কমে যাওয়ায় আউশ উৎপাদন প্রায় ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে আউশ ও আমন মিলিয়ে মোট ধান উৎপাদন বেড়ে ২ কোটি টনে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
এদিকে দেশের সবচেয়ে বড় ধান মৌসুম বোরোর উৎপাদনের চূড়ান্ত হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি বিবিএস। মে-জুন সময়ে বোরো ধান কাটা শেষ হলেও এর আনুষ্ঠানিক উৎপাদন তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জ্বালানি ও সারের ঘাটতির কারণে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বোরো উৎপাদনে সামান্য কমতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে আমন মৌসুমের রেকর্ড উৎপাদন দেশের সামগ্রিক খাদ্যশস্যের সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নত জাতের বীজের ব্যবহার, আধুনিক চাষাবাদ এবং কৃষকদের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ বাড়ায় ধানের উৎপাদনে ধারাবাহিক উন্নতি হচ্ছে। এই ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

