চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা অন্তত ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনারের কোনো খোঁজ মিলছে না। বারবার অনুরোধ করার পরও কাস্টমসকে এসব কনটেইনারের অবস্থান জানাতে পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে সন্দেহভাজন অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির তদন্ত কার্যত থমকে গেছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, সবগুলো কনটেইনার সত্যিই হারিয়ে গেছে কি না তা তারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না। তবে তথ্য না পাওয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অডিট, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপকমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, “আমরা কয়েকবার চিঠি দিয়েছি কিন্তু এখনো কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অনেকগুলো কনটেইনার হয়তো সত্যিই হারিয়ে গেছে—এমন সম্ভাবনা আছে।”
চার বছরের কনটেইনার তালিকা:
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এই ২৫০টি কনটেইনারের মধ্যে ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি রয়েছে। এসব কনটেইনার কাস্টমসের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় ‘লকড’ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব পণ্য ছাড় করা যায় না কিন্তু বাস্তবে এসব কনটেইনার কোথায় আছে, তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, কনটেইনারগুলো খুঁজে না পাওয়ায় কোনো তদন্তই এগোতে পারছে না। সন্দেহভাজন আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বন্দরের ভেতর থেকে লোডেড কনটেইনার হারিয়ে যাওয়ার কয়েকটি ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত এক বছরে অন্তত তিনটি কনটেইনার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় ‘শাহ আমানত ট্রেডিং’-এর মালিক সেলিম রেজা ই-অকশন থেকে ২৭ টন ইন্ডিগো ফেব্রিকের একটি কনটেইনার কিনেছিলেন। তিনি ভ্যাট ও অন্যান্য করসহ প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।
২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি কনটেইনার বুঝে নিতে গেলে জানতে পারেন সেটি বন্দরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চার মাস পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, যৌথ তদন্তেও কনটেইনারটির অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও দুটি পৃথক ঘটনায় মামলা করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, একটি খালি কনটেইনার হালিশহর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, জাল সিল, ভুয়া স্বাক্ষর ও নকল গেট পাস ব্যবহার করে এটি বের করা হয়েছিল। তবে ভেতরের প্রায় ২ কোটি টাকার ফেব্রিক নিখোঁজ। এই ঘটনায় দুইজন বন্দর কর্মচারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন এখনো পলাতক। আরেকটি ঘটনায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ফেব্রিকসহ একটি কনটেইনার এখনো নিখোঁজ।
তদন্তে বন্দরের ডিজিটাল ব্যবস্থার অসংগতি সামনে এসেছে। একটি কনটেইনার হারানোর পরও বন্দরের ওরাকলভিত্তিক সিস্টেমে সেটিকে সিসিটি ইয়ার্ডে রাখা আছে বলে দেখানো হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেখানে কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমেও এর কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এত বড় ব্যবস্থায় এমন অসামঞ্জস্য উদ্বেগজনক। তারেক মাহমুদ বলেন, “সব জায়গায় ডিজিটাল বলা হলেও বাস্তবে যদি কনটেইনারই খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে কোথাও বড় ফাঁক আছে।”
নিয়ম অনুযায়ী, একটি পূর্ণ কনটেইনার ছাড়াতে প্রায় ২৪টি ধাপের অনুমোদন লাগে। বন্দরের বিভিন্ন দপ্তর, কাস্টমস ও গেট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও যাচাই প্রক্রিয়া এতে অন্তর্ভুক্ত। তদন্তকারীদের ধারণা, জাল স্বাক্ষর, ভুয়া সিল ও নকল গেট ডকুমেন্ট ব্যবহার করে এসব নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
কাস্টমস আইন অনুযায়ী, বন্দরে থাকা আমদানি পণ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। এই আইনের ভিত্তিতে কাস্টমস শাহ আমানত ট্রেডিংকে কনটেইনারের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে অর্থ ফেরতের আবেদন করেছে।
বারবার অনুরোধ করা হলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো জানায়নি ২৫০টি কনটেইনার কোথায় রয়েছে বা কীভাবে একাধিক লোডেড কনটেইনার নিখোঁজ হলো। বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সব প্রশ্নের মাঝে এক ভুক্তভোগী আমদানিকারক শুধু জানতে চান—তার কনটেইনারটি শেষ পর্যন্ত গেল কোথায়।

