চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভবিষ্যৎ ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহ। সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত অগ্রগতি এবং চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছেই যেতে পারে।
তবে এই ইস্যুকে ঘিরে কয়েক মাস আগেই যে তীব্র আন্দোলন হয়েছিল, সেই দৃশ্যপট এখন অনেকটাই নীরব। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এনসিটির দায়িত্ব না দেওয়ার দাবিতে মাত্র পাঁচ মাস আগে টানা কর্মসূচি, ধর্মঘট এবং বন্দর অচল করে দেওয়ার মতো কঠোর অবস্থান নিয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু বর্তমানে সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা সংগঠনগুলোর ভূমিকা প্রায় অনুপস্থিত।
এনসিটি পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে গত ৪ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে দুটি পৃথক চিঠি ইস্যু হয়। প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চলমান দর-কষাকষি এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, দর-কষাকষি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলে প্রক্রিয়াটি বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই দিন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভার পর আরেকটি চিঠিতে আবারও দর-কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। অর্থাৎ একই দিনে নীতিগত অবস্থানে ভিন্ন দিকনির্দেশনা আসে, যা এনসিটি ইস্যুকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। বর্তমানে বিষয়টি দর-কষাকষির পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই ১ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষের এক অনুষ্ঠানে এনসিটি নিয়ে আবারও মন্তব্য করেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। এরপর একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনো কিছু গোপন করা হবে না এবং প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ২৬ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুই দেশের পারস্পরিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের এই অগ্রগতি এবং বন্দর চেয়ারম্যানের বক্তব্য মিলিয়ে একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছেই যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
পাঁচ মাস আগে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল উত্তপ্ত। ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে পরিচালনা চুক্তি প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করার পরপরই বন্দর এলাকায় কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে বন্দর ভবন এলাকায় বিক্ষোভ হয়।
পরবর্তীতে ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) সাত দিনের ধর্মঘট পালন করা হয়। এই সময় বন্দরের কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত করা হয়।
এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি বৈঠক হলেও নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। ধীরে ধীরে আন্দোলনের তীব্রতা কমে আসে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির পর থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে এনসিটি ইস্যুতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এবং চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। তারা স্মারকলিপি, মানববন্ধন ও সমাবেশের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।
তবে পাঁচ মাস আগের তুলনায় প্রধান আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এই নীরবতা কি কৌশলগত অবস্থান, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে আন্দোলনের গতি থেমে গেছে—এ নিয়ে আলোচনা চলছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের এক সমন্বয়ক জানান, তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারকে বোঝানোর সুযোগ রয়েছে এবং সেই পথেই তারা এগোতে চান। তবে সমঝোতা না হলে শ্রমিক স্বার্থে নতুন কর্মসূচির ইঙ্গিতও দেন তিনি। অন্যদিকে সংগঠনটির আরেক নেতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত যদি শ্রমিক স্বার্থবিরোধী হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এনসিটি পরিচালনায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সক্ষমতা নিয়েও ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। বন্দর চেয়ারম্যানের মতে, অনেক যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে গেছে এবং আধুনিক মান বজায় রাখতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, বিদ্যমান যন্ত্রপাতি এখনো কার্যকর এবং সক্ষম। তাদের মতে, বর্তমান সক্ষমতা দিয়েই বাড়তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে তারা যুক্তি দিচ্ছেন, যন্ত্রপাতি অকার্যকর হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতো না।
সব মিলিয়ে এনসিটি ইস্যু এখন আবারও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। একদিকে সরকারের নীতিগত অগ্রগতি, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের নীরবতা—দুই মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

