বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। পাঁচ দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো বলেছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী জাইকা।
সোমবার (৬ জুলাই) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সফরকালে জাইকা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে উভয় পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
সফরের শুরুতে তিনি ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত সাত জাপানি নাগরিকের স্মরণে আয়োজিত দশম বার্ষিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের মধ্যে শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহযোগিতার সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দুই দেশের চলমান উন্নয়ন সহযোগিতা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প। এছাড়া জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে দেওয়া ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
সফরকালে তিনি সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, জ্বালানি খাত, স্থানীয় সরকার, পরিবহন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পও সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ড. তানাকা। তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনাল ঘুরে দেখে প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, প্রকল্পটি চালু হলে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা, বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের আধুনিক অবকাঠামোগত সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও কাজ করবে।
মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, এসব প্রকল্প শুধু বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এসব উদ্যোগ জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কক্সবাজার সফরে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে চলমান মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ই-ভাউচার কেন্দ্র, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম এবং জাইকার সহায়তায় পরিচালিত জীবিকাভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
একই সফরে কক্সবাজারের ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার এবং উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের আয় বৃদ্ধি ও বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির প্রকল্পও পরিদর্শন করেন তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মৎস্য খাতের আধুনিকায়ন, পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সফরের শেষ দিনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এবং জাপানি প্রযুক্তিনির্ভর ‘জে-ড্রাম’ উদ্যোগ পরিদর্শন করেন জাইকা প্রেসিডেন্ট। এ সময় তিনি নগর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রমে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সফর শেষে ড. তানাকা আকিহিকো বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আগামী বছরগুলোতেও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচিতে জাইকা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

