যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের প্রভাবে চীনের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সেই শূন্যতার বড় একটি অংশ পূরণ করছে বাংলাদেশ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার চাপের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ইউএস অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
তবে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এলেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানিকৃত পোশাকের পরিমাণও ৬ দশমিক ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে চীনের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটির রপ্তানি ছিল ৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানির পরিমাণও কমেছে ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং প্রতি ইউনিট পোশাকের গড় মূল্য কমেছে ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
চীনের এই বড় পতনের ফলেই বাংলাদেশ ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও পাঁচ মাসের সামগ্রিক চিত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে, মে মাসে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৫৮২ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা ২০২৫ সালের একই মাসের ৫৪৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যিক বিরোধ এবং অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতারা এখন বিকল্প সরবরাহকারী দেশের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যার অন্যতম সুবিধাভোগী বাংলাদেশ। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই সংকুচিত বাজারেও কয়েকটি দেশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ভিয়েতনাম ৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। দেশটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। কম্বোডিয়া ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিও ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়েছে।
বিজিএপিএমইএ পরিচালক এবং কাজী প্রিন্টিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফাহাদ বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ কমলেও চীনের রপ্তানি প্রায় ৪৩ শতাংশ কমেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তাঁর মতে, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য, উদ্ভাবন এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্প এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বমানের অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে এ শিল্প রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। সরকার, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট শিল্পখাত সমন্বিতভাবে কাজ করলে শুধু দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখাই নয়, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিও আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

