বাংলাদেশের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান শিগগিরই ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা ছাড়াই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতার কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ পেতে পারেন। সরকার প্রথমবারের মতো ক্রস বর্ডার (আন্তসীমান্ত) ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির খসড়াটি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করতে সভা আয়োজনের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
নীতিমালাটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কোনো এজেন্টের ওপর নির্ভর না করে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি অনলাইনে অর্ডার নিতে পারবেন। একইভাবে দেশের ভোক্তারাও আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ায় পণ্য কিনতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিয়মিত অনলাইনে কেনাকাটা করেন। বৈশ্বিক খুচরা বাণিজ্যের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশই এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা (বিটুবি) এবং ব্যবসা-থেকে-ভোক্তা (বিটুসি)—উভয় ক্ষেত্রেই অনলাইন বাণিজ্যের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। এই বিশাল বাজারে অংশ নিতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের নীতিমালা ও কাঠামো প্রয়োজন।
বর্তমানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিদেশে অল্প পরিমাণ ফল, সবজি বা অন্যান্য পণ্য পাঠাতে গেলে অনেক সময় লাগেজ পার্টি বা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। এসব লেনদেনের অর্থ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সুস্পষ্ট আন্তসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা না থাকায় বিদেশি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সময়ও ভোক্তাদের অর্থ পরিশোধে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় অনলাইন লেনদেন নিরাপদ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্রস বর্ডার এস্ক্রো সার্ভিস চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, বিদেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রসেসিং সেন্টার ও ওয়্যারহাউস স্থাপনে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নীতিমালায় নকল বা ভেজাল পণ্যের অনলাইন বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি অনলাইন লটারি, জুয়া, বেটিং ও গেমিং পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া গিফট কার্ড, গিফট ভাউচার বা অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন কোনো ডিজিটাল মাধ্যম কেনাবেচাও নিষিদ্ধ থাকবে।
বিদেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চাইলে বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দেশে নিবন্ধিত কোম্পানি ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ থাকবে না।
নীতিমালা কার্যকর হলে এলসি ছাড়াই ডিজিটাল মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে পণ্য ও সেবা আমদানি-রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। এতে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবে, তেমনি দেশের অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশি বাজারে নিজেদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র, কুটির ও হস্তশিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য বৈশ্বিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানোর পথ সহজ হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চীন বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল ও পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফল আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে অল্প পরিমাণ পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এলসি প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল হয়ে দাঁড়ায়।
নতুন নীতিমালা অনুমোদিত হলে কৃষক বা উদ্যোক্তা নিজের উৎপাদিত পণ্যের ছবি অনলাইনে প্রদর্শন করে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি অর্ডার নিতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো বাগান মালিক অনলাইনে আমের ছবি প্রকাশ করলে চীনের একজন ক্রেতা সরাসরি সেই পণ্য অর্ডার করতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রয়োজন কমবে এবং উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এ ছাড়া জামদানি, হস্তশিল্প এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ মোস্তাহিদাল হক বলেন, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে পণ্য এনে অনলাইনে বিক্রি করছে। ফলে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিতভাবে পৌঁছাতে পারছে না। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য বৈশ্বিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সহজেই বিক্রির সুযোগ পাবে।
দারাজ বাংলাদেশের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, বর্তমানে একটি জামদানি শাড়ি বা হাতে তৈরি পোশাক বিদেশি ক্রেতার কাছে পাঠাতে কুরিয়ার ও অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হয়। আন্তসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা চালু হলে বিদেশি ক্রেতারা অনলাইনে প্রদর্শিত বাংলাদেশের এক বা একাধিক পণ্য সরাসরি কিনতে পারবেন এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও সহজ হবে।

