মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ এবং দামের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সরকারি সূত্র বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হয়েছে। কিন্তু দেশে তা তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় সরকারের মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত শুধু তেল আমদানিতেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে। অবশিষ্ট লোকসান হয়েছে এলএনজি আমদানিতে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরবরাহকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতার ফলে উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় কম প্রিমিয়ামে তেল কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাবদ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করছে না। ফলে বর্তমানে প্রয়োজনীয় এলএনজি স্পট মার্কেট থেকেই সংগ্রহ করছে পেট্রোবাংলা। ভবিষ্যতেও একই উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তিনি জানান, গত মাসে যুদ্ধবিরতির পর এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার কোন দিকে যায়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ২৮ ডলারে কিনতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। যুদ্ধবিরতির পর গত সপ্তাহে একই এলএনজি ১৬ থেকে ১৭ ডলারের মধ্যে কেনা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ওঠানামা করছে। গত শুক্রবার প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ছিল ৭৬ দশমিক ১০ ডলার। অথচ মার্চ-এপ্রিলের সংঘাতের সময় তা ১১৪ ডলারেরও বেশি হয়েছিল।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল মিলিয়ে মোট ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল জি-টু-জি ব্যবস্থায় কেনা হবে। এ লক্ষ্যে গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে ১০টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মূলত জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয় বা প্রিমিয়াম নিয়ে আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, প্রথমে ভারতের আইওসিএল প্রতি ব্যারেলে ৯ দশমিক ৫ ডলার প্রিমিয়ামে ডিজেল সরবরাহে সম্মতি দেয়। পরে ইউনিপেক, পেট্রোচায়নাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই প্রিমিয়ামে সরবরাহে রাজি হয়। অথচ জুন থেকে আগস্ট সময়ের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা জ্বালানি তেলে সরকারকে সাড়ে ১৩ ডলারেরও বেশি প্রিমিয়াম দিতে হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ১৪ ডলারের বেশি প্রিমিয়াম দাবি করলেও পরে ভারতের প্রস্তাবের পর অন্যরাও কম প্রিমিয়ামে রাজি হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ামের প্রতি এক সেন্ট কমলে প্রায় ৮২ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়। সেই হিসাবে এবারের সমঝোতায় মোট প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। এখন এটি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই তেল কিনতে সরকারের ব্যয় ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ব্যয় নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের ওপর।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত চার মাসে জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ সরকার থেকে কোনো অর্থ পায়নি সংস্থাটি। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার করেই তেল আমদানি করতে হয়েছে। এর ফলেই মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ বহন করতে হয়েছে বিপিসিকে। সংস্থাটি একাধিকবার অর্থ বিভাগের কাছে ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠালেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুতকে সন্তোষজনক বলে মনে করছে বিপিসি। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ১৪ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ৩৪ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। অকটেনের মজুতও প্রায় ৪০ দিনের জন্য পর্যাপ্ত।
এ মাসে আরও ৮ থেকে ১০টি ডিজেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, সংঘাত শুরুর সময় ৩০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানিতে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় হলেও বর্তমানে একই পরিমাণ তেল আনতে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, গত মার্চের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই দেশের বিভিন্ন ডিপোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও আপাতত দেশে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।

