দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা রাজশাহীর দুটি সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরেছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের উদ্যোগে চালু হওয়া এসব কারখানায় ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শুধু উৎপাদনই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনারও সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ইউনিট চালু হলে আগামী কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বাড়বে।
একসময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল বরেন্দ্র রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস। সত্তরের দশকের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করা এই মিল বহু বছর হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস ছিল। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ২০০৩ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ২৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত কারখানাটি এরপর দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল।
পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে প্রায় ১৫ মাস আগে। প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ কারখানাটি পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে সেখানে ব্যাগ উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে দিন-রাত মিলিয়ে আড়াই হাজারের বেশি কর্মী বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ ও লাগেজ তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কাছে রপ্তানি হচ্ছে।
শুধু টেক্সটাইল মিল নয়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাজশাহী জুট মিলও একইভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা করছে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ। এ দুটি কারখানায় এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী নগরীর সপুরা বিসিক শিল্পনগরে একটি বন্ধ বেসরকারি কারখানাও ভাড়া নিয়ে চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে প্রায় এক হাজার শ্রমিক ব্যাগ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
সম্প্রতি কারখানাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, টেক্সটাইল মিলে ব্যাগ উৎপাদন হলেও রাজশাহী জুট মিলে জুতা, তাঁবু ও ছাতা তৈরির কাজ চলছে। উৎপাদিত জুতা ও তাঁবু ইতোমধ্যে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। অচিরেই ছাতাও আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে নতুন উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, নতুন কারখানাগুলোয় কর্মরত অনেকেই আগে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ কিংবা নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাজ করতেন। রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তারা নিজ এলাকায় ফিরে এসে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেই চাকরি করতে পারছেন। এতে একদিকে রাজধানীকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলের ওপর চাপ কমছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হচ্ছে।
বর্তমানে নরসিংদী, রাজশাহী, রংপুর ও পাবনায় প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের জুতা ও লাগেজ উৎপাদনের আটটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গত ১৬ মাসে চালু হয়েছে ছয়টি। আন্তর্জাতিক বাজারে জুতা ও লাগেজের চাহিদা বাড়তে থাকায় দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে এই খাতে প্রায় ১২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুতা ও লাগেজ রপ্তানি থেকে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের আয় ছিল ৯২ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরে সেই রপ্তানি আয় ৯২ শতাংশের বেশি বেড়ে ১৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জুতা ও লাগেজের ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। তবে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সেই বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে। এ কারণেই নতুন জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত চালু করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
কারখানার কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো ভবনের কাঠামো ব্যবহার করেই আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। উঁচু ছাদের কাচের মাধ্যমে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করায় বিদ্যুতের ব্যবহারও তুলনামূলক কম হচ্ছে। কারখানার ভেতরে কৃত্রিম চামড়া, কাপড় ও ফোম কাটার কাজ থেকে শুরু করে সেলাই, সংযোজন, মান যাচাই এবং মোড়কজাত—সব ধাপেই ব্যস্ত সময় পার করছেন শত শত শ্রমিক।
এই কারখানার কর্মী চাঁপা বেগম আগে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। চাকরির কারণে ছোট মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে রেখে থাকতে হতো। এখন রাজশাহীর পবা উপজেলা থেকে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। তিনি জানান, বাড়ির কাছাকাছি কাজ পাওয়ায় পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারছেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমেছে এবং মেয়েকে নিজের কাছেই রেখে বড় করার সুযোগ মিলেছে।
কারখানার ভেতরে নতুন গুদাম নির্মাণ, অতিরিক্ত উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং একটি পুকুর সংস্কারের কাজ চলছে। সেখানে মাছ চাষেরও পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রুপটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে শুধু এই কারখানাতেই প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাপক রাজীব কবিরাজ জানান, শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক সুবিধাও চালু রয়েছে। মাত্র ৮ টাকায় দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। দূরবর্তী এলাকার কর্মীরা মাসে ২০০ টাকা খরচে ডরমিটরিতে থাকতে পারেন। বর্তমানে দেড় শতাধিক শ্রমিক এই আবাসন সুবিধা ব্যবহার করছেন।
রাজশাহীর শ্যামপুরে অবস্থিত দীর্ঘদিনের বন্ধ জুট মিলটিও এখন নতুন রূপ পেয়েছে। একটি ভবনে জুতা, তাঁবু ও ছাতা উৎপাদন চলছে, অন্য ভবনে নতুন যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ চলছে। ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পাটকল বহু বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর একই বছরের ডিসেম্বরে উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় এক হাজার মানুষ কাজ করছেন। নতুন ইউনিট চালু হলে কর্মসংস্থান চার হাজারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই কারখানায় তাঁবু উৎপাদনের কাজে যুক্ত রয়েছেন শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করছেন। তাঁর ভাষ্য, নিজ এলাকায় চাকরির সুযোগ পাওয়ায় উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের আয়ও বেড়েছে।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের জুতা, ব্যাগ, লাগেজ ও তাঁবু বিভাগের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. রাহাত হোসেন বলেন, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে জমি অধিগ্রহণ থেকে উৎপাদন শুরু পর্যন্ত সাধারণত দুই বছরের বেশি সময় লাগে। কিন্তু পরিত্যক্ত সরকারি কারখানা ব্যবহার করায় মাত্র তিন মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়েছে। এতে সময় ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপন করলে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা সহজে পাওয়া যায়। তবে কাঁচামাল পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত কিছু সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এসব বিষয়ে সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে রাজধানীর বাইরে শিল্পায়নের গতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার আওতায় এনে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা গেলে একদিকে যেমন অব্যবহৃত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকেন্দ্রীকৃত শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানির ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।

