বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল থাকার পর এখন অপ্রচলিত বাজারগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। সেই কৌশলের ইতিবাচক ফলও মিলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা দেশের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টাকে নতুন গতি দিচ্ছে।
সরকারি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত চার অর্থবছরে লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রায় ২৯ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক শিল্প। পাশাপাশি পাট, চামড়া এবং অন্যান্য কিছু শিল্পপণ্যের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ঐতিহ্যগত বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই বাংলাদেশ নতুন বাজার খুঁজে বের করার কৌশল নিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে এই অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৬৭ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার। চার বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৭৫ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মাঝের সময়েও ধারাবাহিক উন্নতি দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই অঞ্চলে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৬২ দশমিক ০২ মিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তী অর্থবছরে বেড়ে ৪৪২ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে লাতিন আমেরিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল। দেশটিতে রপ্তানি কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১০৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। পরের বছর তা বেড়ে ১৪৭ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলার হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি পৌঁছে ১৮৭ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলারে, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ২১৪ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের বিশাল ভোক্তা বাজার এবং পোশাকের চাহিদা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
শুধু ব্রাজিল নয়, চিলিও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিলিতে বাংলাদেশের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৬৯ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলার। দেশটিতে মূলত নিট পোশাক, টি-শার্ট, পুরুষদের আনুষ্ঠানিক পোশাক এবং নারীদের বিভিন্ন ধরনের পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে উরুগুয়ে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের আরেকটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে উঠে আসছে। সেখানে নিট পোশাক, সোয়েটার এবং বিশেষ ধরনের বোনা পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উরুগুয়েতে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৩৯ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলার।
আর্জেন্টিনার বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও প্রবৃদ্ধির হার বেশ আশাব্যঞ্জক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলার। সেখানে নিট সোয়েটার, ক্রীড়া পোশাক এবং কাঁচা পাটজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশ থেকে লাতিন আমেরিকায় প্রধানত পুরুষ ও নারীদের পোশাক, টি-শার্ট, সোয়েটার, শার্ট, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়। তৈরি পোশাক এখনও সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হলেও অন্যান্য পণ্যের উপস্থিতিও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির মাঝেও বড় একটি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটের সদস্য দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। এই উচ্চ শুল্কের কারণে বাংলাদেশের পণ্য স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়, ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাণিজ্য জোটে রয়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে। ব্যবসায়ীদের মতে, এই দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক কমানো বা মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকায় রপ্তানির ধারাবাহিক বৃদ্ধি প্রমাণ করছে যে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা নতুন বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে শুধু বাজার খুঁজে পেলেই হবে না, বরং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
এ কারণে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারের প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি উচ্চ শুল্কের বাধা দূর করা যায় এবং কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হয়, তাহলে লাতিন আমেরিকা আগামী দশকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন রপ্তানি বাজার আরও বৈচিত্র্যময় হবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আরও স্থিতিশীল ভিত্তি পাবে।

