বাংলাদেশে নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। দৈনন্দিন কেনাকাটা, টাকা পাঠানো, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ কিংবা সরকারি ভাতা গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই এখন মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই দেশের অন্যতম মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদ নতুন একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
প্রতিষ্ঠার মাত্র সাত বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৪৪ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা লেনদেন সম্পন্ন করেছে। ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রতিফলন নয়, বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সেবার সহজলভ্যতা এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অল্প সময়ে বড় অবস্থান
নগদ যাত্রা শুরু করে ২০১৯ সালে। সে সময় দেশের মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে প্রতিযোগিতা সীমিত ছিল। হিসাব খোলা ছিল তুলনামূলক জটিল, লেনদেনের খরচও ছিল বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এসব সেবা সহজে গ্রহণ করা কঠিন ছিল।
সেই বাস্তবতায় নগদ অপেক্ষাকৃত কম খরচে এবং সহজ পদ্ধতিতে সেবা দেওয়ার কৌশল নেয়।
প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সেবা চালু করে, নগদ উত্তোলনের খরচ কমায় এবং ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই হিসাব খোলার সুযোগ চালু করে। পরবর্তীতে বৈশ্বিক মহামারির সময় এই ডিজিটাল পদ্ধতি আরও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, কারণ তখন অনেক মানুষ সরাসরি ব্যাংক বা সেবাকেন্দ্রে যেতে পারছিলেন না।
প্রযুক্তির ব্যবহারেই ব্যয় কমেছে
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তাদের পরিচালন ব্যয় কমিয়েছে। সেই সুবিধা গ্রাহকদের কাছে কম লেনদেন ব্যয় এবং সহজ সেবার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত মোবাইল আর্থিক সেবায় পরিণত হয়।
একটি ২০২৪ সালের ভোক্তা জরিপেও দেশের সব ধরনের ব্র্যান্ডের মধ্যে গ্রাহক পছন্দের তালিকায় নগদ দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করে।
গ্রাহকের আস্থাই সবচেয়ে বড় শক্তি
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োজিত প্রশাসক মো. মোতাসেম বিল্লাহ মনে করেন, যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং সহজ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে নগদ কোটি মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
এই আস্থার প্রতিফলনও দেখা যায় গ্রাহকদের আচরণে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, যেকোনো সময়ে গ্রাহকদের হিসাবে সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা জমা থাকে।
সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বড় মাধ্যম
সহজে হিসাব খোলার সুযোগ চালু হওয়ার ফলে সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে নগদ।
সরকারি ভাতা, শিক্ষাবৃত্তি, উৎসবভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সহায়তা দ্রুত মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে।
বর্তমানে অন্যান্য মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমেও সরকারি অর্থ বিতরণ করা হলেও এখনও ৩ কোটির বেশি উপকারভোগী এই সেবা ব্যবহার করছেন।
এ পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ৪৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিতরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি অর্থ বিতরণ দুর্নীতি কমানো, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সারা দেশে বিস্তৃত সেবা
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় শক্তি হলো এর বিস্তৃত সেবা নেটওয়ার্ক।
বর্তমানে সারা দেশে ৩ লাখের বেশি এজেন্ট বিভিন্ন এলাকায় নগদ জমা ও উত্তোলনের সেবা দিচ্ছেন। ফলে শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সহজে ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ নয়। আর্থিক সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই ধরনের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ডিজিটাল অর্থনীতির পথে
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার ফলে নগদ অর্থের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমছে। এর ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। পাশাপাশি ডাক বিভাগের সঙ্গে অংশীদারত্বের আওতায় ২৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা আয় ভাগাভাগি করেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে
ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিভিন্ন সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং উদ্ভাবনী সেবার জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে তারা।
নতুন সেবায় আরও সহজ হবে লেনদেন
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক এবং সব মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে আন্তঃলেনদেন সুবিধা চালু করেছে। পাশাপাশি দেশের ১০ লাখ বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগও যুক্ত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব উদ্যোগ ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ করবে এবং ভবিষ্যতে নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবার দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সুফল তখনই টেকসই হবে, যখন সেবার মান, নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের আস্থা একই সঙ্গে বজায় রাখা সম্ভব হবে।

