বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো। সংস্থাটি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাত থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষে দ্রুত অনুমোদনেরও অনুরোধ জানিয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো।
প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত করার আগে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সহসভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে তৈরি পোশাক, নিট পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা, সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল বিশ্লেষণ করে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনও স্থিতিশীল থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে একাধিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্য রপ্তানিকারকদের মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টিও ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানো, শুল্ক ও কাস্টমস কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা, শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং নগদ প্রণোদনা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপরও জোর দেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এসব বাণিজ্য চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় তৈরি পোশাক খাতকে আবারও দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এই খাত থেকে ৪৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিট পোশাক থেকে ২৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং বোনা পোশাক থেকে ২১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার আয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুধু পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতেও বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে ১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু চামড়ার জুতা থেকেই ৮১০ মিলিয়ন ডলার আয় প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে তামাক থেকে ২৩০ মিলিয়ন ডলার এবং ফলমূল থেকে ১৭০ মিলিয়ন ডলার আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে ১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার নয়, বরং ১ দশমিক ০১৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু পাটের সুতা থেকেই ৬২০ মিলিয়ন ডলার আয় হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গৃহস্থালি বস্ত্র থেকে ১ দশমিক ০৬৫ বিলিয়ন ডলার, প্রকৌশল পণ্য থেকে ৮০৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার এবং ওষুধ শিল্প থেকে ২৯০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শুধু পণ্য নয়, সেবা খাতেও বড় সম্ভাবনা দেখছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো। আগামী অর্থবছরে ৯ বিলিয়ন ডলার সেবা রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন সেবা থেকে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবা থেকে ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটারভিত্তিক সেবা থেকে ৮৫৫ মিলিয়ন ডলার এবং টেলিযোগাযোগ সেবা থেকে ৯৩৫ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার আয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ৬৬ বিলিয়ন ডলারের এই লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও তা অর্জন অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং পরিবর্তিত বাণিজ্য পরিবেশে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

