বাংলাদেশের আরও চারটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলো হলো বান্দরবানের থামি, পাবনার গাওয়া ঘি, মানিকগঞ্জের কাঠের ঘর এবং ঠাকুরগাঁওয়ের আম্রপালি আম। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে এসব পণ্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) সহকারী পরিচালক মজনু ভূঁইয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জিআই স্বীকৃতি শুধু একটি পণ্যকে নিবন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী পণ্য রয়েছে, যেগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেসব পণ্য চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডিপিডিটিতে মোট ১০৯টি জিআই আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪টি পণ্য ইতোমধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে। আরও একটি পণ্য সরকারি জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি আবেদনগুলো যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে।
পরীক্ষাধীন আবেদনগুলোর মধ্যে রয়েছে খালিশপুরের চমচম, পটুয়াখালীর মুগডাল, বরগুনার মুগডাল, যশোরের রজনীগন্ধা ফুল, ঝিনাইদহের পেয়ারা এবং নাটোরের বাগাতিপাড়ার শাখার অলংকারসহ আরও বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য।
ডিপিডিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পরই নতুন জিআই পণ্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন পণ্যগুলো জিআই স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের পরিচিতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকরা উন্নত বাজার, বাড়তি মূল্য এবং ব্র্যান্ড পরিচিতির সুযোগ পাবেন।
জিআই স্বীকৃতি কী?
ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই এমন একটি স্বীকৃতি, যা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য কিংবা স্থানীয় দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যের পরিচয় নিশ্চিত করে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে পণ্যের ভৌগোলিক উৎস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। ফলে একই নামে অন্য অঞ্চলের পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ সীমিত হয় এবং প্রকৃত উৎপাদকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, জিআই সনদ কেবল সম্মানজনক স্বীকৃতিই নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদও। এই স্বীকৃতি পেলে পণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি, ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়।
বান্দরবানের থামি পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খিয়াংসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নারীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেশীয় তাঁতযন্ত্রে হাতে এই পোশাক বুনে আসছেন। সুতি বা অন্যান্য সুতা দিয়ে তৈরি প্রতিটি থামির নকশা ও রঙে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, পরিচয় ও জীবনধারার প্রতিফলন দেখা যায়। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্যই পণ্যটিকে জিআই স্বীকৃতির সম্ভাব্য তালিকায় স্থান করে দিয়েছে।
দেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাত পণ্য হিসেবে পাবনার গাওয়া ঘির সুনাম বহুদিনের। খাঁটি গরুর দুধ, স্থানীয় খামারিদের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষ প্রস্তুতপ্রণালিই এর স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে। প্রথমে দুধ থেকে দই, পরে দই থেকে মাখন তৈরি করা হয়। এরপর মাখন দীর্ঘ সময় কম আঁচে জ্বাল দিয়ে সোনালি রঙের ঘিতে পরিণত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বিশেষ সুবাস, যা পাবনার গাওয়া ঘির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এখনও অনেক উৎপাদক কাঠ বা মাটির চুলায় ধীর আঁচে ঘি প্রস্তুত করেন। রান্না, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবারে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছেও এ পণ্যের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।
মানিকগঞ্জের কাঠের ঘর স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা ও নির্মাণশৈলীর জন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। বিশেষ করে ঘিওর, সাটুরিয়া এবং আশপাশের এলাকায় বহু বছর ধরে কাঠের আবাসিক ঘর, কটেজ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
এসব ঘর নির্মাণে সাধারণত সেগুন, গামারি, চাপালিশ ও মেহগনির মতো টেকসই কাঠ ব্যবহার করা হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হলেও সূক্ষ্ম নকশা, খোদাই ও ফিনিশিংয়ের কাজ এখনো দক্ষ কারিগরদের হাতেই সম্পন্ন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নতমানের কাঠ ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে একটি কাঠের ঘর কয়েক দশক পর্যন্ত টেকসই থাকতে পারে।
উৎপাদন, স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে ঠাকুরগাঁওয়ের আম্রপালি আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। জেলার অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর দো-আঁশ মাটি এবং আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা এই জাতের আমের মান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও এই আমে শাঁস বেশি, আঁটি পাতলা এবং আঁশ কম। ফলে ভোক্তাদের কাছে এর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয় কৃষকেরা সাধারণত কলমের চারা ব্যবহার করে বাগান গড়ে তোলেন। ফুল আসা থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ, ছাঁটাই এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উন্নতমানের ফল উৎপাদন করা হয়। ভালো স্বাদ, তুলনামূলক দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের সুবিধা এবং দূরবর্তী বাজারে পরিবহনের উপযোগিতার কারণে এই আম রপ্তানিরও সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিপিডিটির উপ-পরিচালক আমিন মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, কোনো পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেলে তার উৎস ও মান সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে। পাশাপাশি নকল বা ভেজাল পণ্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচিতি শক্তিশালী হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জিআই সনদ অর্জনের পরেও কাজ শেষ হয়ে যায় না। এই স্বীকৃতির পূর্ণ সুফল পেতে হলে পণ্যের মান ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা, কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণ এবং রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই জিআই স্বীকৃতি দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।

