কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মাতারবাড়ীতে নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম বৃহৎ আন্তর্জাতিক মানের ডকইয়ার্ড ও জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ দেশেই মেরামতের সুযোগ পাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক সামুদ্রিক সেবাকেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচিতি লাভ করতে পারে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের জন্য প্রস্তাবটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূল্যায়ন শেষে পরবর্তী ধাপে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হবে।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বিদেশি ও বেসরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হলেও জমির মালিকানা সরকারের কাছেই থাকবে। ল্যান্ডলর্ড মডেলে নির্মিত এই ডকইয়ার্ডের জন্য মহেশখালীতে প্রায় ২০০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে নির্মিত ডকইয়ার্ডসহ সব অবকাঠামো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তর করা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহারকারী বড় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ভারী মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ডকিংয়ের জন্য সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা চীনের বন্দরে যেতে হয়। এতে সময়ের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হয়।
নতুন প্রকল্পের আওতায় মাতারবাড়ীতে ৬০০ মিটার দীর্ঘ এবং ৯৫ মিটার প্রশস্ত একটি আধুনিক শুষ্ক ডক নির্মাণ করা হবে। এটি চালু হলে বড় আকারের মাদার ভেসেলসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ দেশেই মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি বিদেশি জাহাজকে মেরামত সেবা দিয়ে বাংলাদেশ নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। এতে দেশের ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির বিকাশ ত্বরান্বিত হবে এবং সামুদ্রিক শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড প্রকল্পটির প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করবে। সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও সরকারি জমি ও স্থাবর সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এই গ্রিন ডকইয়ার্ড প্রকল্প সেই সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করবে। সরকারি জমির শতভাগ মালিকানা সংরক্ষণ করে বিদেশি ও বেসরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিগত অনুমোদনের পর এখন কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের কাজ চলছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে নির্মাণকাজ শুরু হবে।
প্রকল্পটির প্রশাসনিক দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণত দেশের ডকইয়ার্ড শিল্প শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং বন্দর চ্যানেল ব্যবস্থাপনার বিষয় বিবেচনায় গত ৭ জুন অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পে অনাপত্তি প্রদান করেছে। ফলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ আরও সহজ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মাতারবাড়ী ডকইয়ার্ড বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতা কমাতে পারবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সেবাকেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সামুদ্রিক শিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

