হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে পেসমেকার, হার্ট ভালভ, ভাসকুলার স্টেন্ট (রিং) ও অক্সিজেনেটরসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ লক্ষ্যে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন (এসআরও) জারির প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়েছে। এটি কার্যকর হলে আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে করের চাপ কমবে এবং এর সুফল রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়েও প্রতিফলিত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরবরাহ পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। নতুন এসআরও জারি হলে এই দুই স্তরেই ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হবে।
এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে হার্টের স্টেন্টের সরবরাহকারী পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সে সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এবার সেই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরও কয়েকটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জামকে ভ্যাটমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এ-সংক্রান্ত এসআরওর খসড়া প্রায় চূড়ান্ত। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। এরপর থেকেই চারটি চিকিৎসা সরঞ্জামে ভ্যাট অব্যাহতি কার্যকর হবে।
রাজস্ব বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশে হৃদরোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসাসেবা আরও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করতে সরকার জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর করের বোঝা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, স্টেন্ট, হার্ট ভালভ, পেসমেকার ও অক্সিজেনেটর সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর পণ্য। এসব পণ্যের ওপর কর কমানো হলে আমদানিকারক ও হাসপাতালের ব্যয় কমবে। এর ফলে বাজারমূল্যও কমার সুযোগ তৈরি হবে এবং রোগীরা তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শুধু হার্টের স্টেন্টের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ হাজার রোগীর শরীরে স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটেই বছরে ৯ হাজারের বেশি স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়।
এ ছাড়া দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টি হার্ট ভালভ এবং ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজারটি পেসমেকারের প্রয়োজন হয়। ফলে এসব পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি কার্যকর হলে বিপুলসংখ্যক হৃদরোগী সরাসরি উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে বাংলাদেশে ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে একটি হার্টের স্টেন্টের দাম ২০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। অন্যদিকে পেসমেকারের দাম ৮০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। তাই কর কমানো হলে উচ্চমূল্যের এসব চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অধিকাংশ আধুনিক সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে কর ও শুল্কের প্রভাব সরাসরি রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর পড়ে। এ অবস্থায় ভ্যাট অব্যাহতির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উন্নত চিকিৎসা আরও সাশ্রয়ী হবে এবং জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা গ্রহণে রোগীদের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে।

