বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ের ধীরগতির কারণ পর্যালোচনা শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ লক্ষ্যে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল সোমবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে বৈঠক করে দেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণের ব্যয়, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়ন পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।
বৈঠকে আইএমএফ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের সুদের ব্যয়, স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ, বাজারভিত্তিক ভাসমান সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা, গড় ঋণ ব্যয় এবং আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ঋণ ছাড় কমে যাওয়ার কারণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের বাজেট সহায়তা হ্রাসের বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ইআরডির কর্মকর্তারা আইএমএফকে জানান, বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন ‘স্বল্প ঝুঁকির স্থিতিশীলতা’ পর্যায় থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকির ত্বরান্বিত’ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তাদের মতে, আগের তুলনায় স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের সুযোগ কমে যাওয়ায় ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ করে জাপানসহ দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতারা ধীরে ধীরে কম রেয়াতি ঋণের দিকে ঝুঁকছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর বাজারভিত্তিক ভাসমান সুদের ঋণের অংশও বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল ভাসমান সুদের ঋণ এবং সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এ অনুপাত আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হবে বাংলাদেশকে। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে মোট প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হলেও তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমপরিমাণ অর্থ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে। ফলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা আইএমএফকে আরও জানান, বর্তমান সরকার আগের প্রশাসনের সময় অনুমোদিত অনেক প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করছে। ফলে নতুন বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প অনুমোদনে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি কিছুটা কমে যাওয়ায় বিদেশি ঋণ ছাড়ও প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রতিশ্রুত কিন্তু এখনো ছাড় না হওয়া বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণ ছাড় হয়েছে ৪ দশমিক ৫৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫ দশমিক ৪৮৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ কম।
ইআরডির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ ছাড় ছিল ৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ১০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ ছাড়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বৈঠকে বাজেট সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে এই সহায়তা আরও কমতে পারে বলে ধারণা করছে সরকার।
কর্মকর্তারা জানান, কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় উন্নয়ন সহযোগীদের বাজেট সহায়তা বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন আবারও বেড়েছে।
এদিকে আগের সরকারের সময় ২০২৩ সালে নেওয়া ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ এখন নতুন করে তিন বছরের জন্য ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি ঋণ কর্মসূচি চাচ্ছে। নতুন এই কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করতেই আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ১২ জুলাই ঢাকায় আসে। পাঁচ দিনের এই সফরে তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা মূল্যায়ন করছে।

