দেশের জ্বালানি তেল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে বড় পদক্ষেপ হিসেবে এগোচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-২ (ইআরএল-২) প্রকল্প। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রায় ২০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। এতে বছরে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকার সমান।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে ‘ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ’ পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ৭ জুলাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোনের বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন পাওয়া বর্তমানে কঠিন হয়ে পড়েছে। সে কারণে তুলনামূলক কঠোর শর্ত থাকা সত্ত্বেও আইএসডিবির অর্থায়নের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ইআরএল-২ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে। প্রকল্পটি চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা যুক্ত হবে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। ফলে প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে দেশের মোট পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউর রহমান জানান, প্রকল্পটির ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (এফআইআরআর) ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং ইকোনমিক ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (ইআইআরআর) ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ।
তিনি বলেন, আইএসডিবির প্রস্তাবিত ঋণ বাস্তবায়িত হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে গড়ে ২০ ডলার সাশ্রয় সম্ভব হবে। এর ফলে বছরে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
আইএসডিবির ঋণ প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে প্রায় ৫২০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ঋণের পাশাপাশি ৬ লাখ ডলার কারিগরি সহায়তা অনুদান দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪৮৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় করা হবে।
ঋণের মেয়াদ ২০ বছর এবং এর মধ্যে প্রথম ৫ বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড। সুদের হার নির্ধারণ করা হবে ছয় মাস মেয়াদি সোফর (Secured Overnight Financing Rate) এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৬ শতাংশ স্প্রেড যোগ করে। ৫ জুলাইয়ের হিসাবে ছয় মাসের সোফর ছিল ৩ দশমিক ৮৪৬ শতাংশ। সেই হিসাবে মোট সুদের হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪৪৬ শতাংশ।
বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন পাওয়া এখন অত্যন্ত কঠিন। তবে আইএসডিবির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে এই প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর বলেন, প্রকল্পের বড় অংশের ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রায় হওয়ায় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিবেচনায় বিদেশি ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বৈঠকে জানান, আইএসডিবির অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক। এ কারণে ‘ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ’ পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হবে, যা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে সহায়ক হবে।
এই পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একই সময়ে পৃথক দুটি খামে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। প্রথমে শুধু কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব পরে খুলে মূল্যায়ন করা হয়।

