বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। একের পর এক নাটকীয় ম্যাচ শেষে শিরোপার লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের মতো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও অপেক্ষা করছেন বহুল প্রতীক্ষিত এই ফাইনালের জন্য। তবে ফুটবল উন্মাদনার পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশে এই দুই দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টিও।
বাংলাদেশের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ও স্পেন—উভয় দেশেরই দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে বাণিজ্যের ধরনে রয়েছে বড় পার্থক্য। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হলেও স্পেনের সঙ্গে সম্পর্ক মূলত রপ্তানিকেন্দ্রিক।
আর্জেন্টিনা থেকে আমদানিই বেশি:
বাংলাদেশের শীর্ষ ২০ আমদানিকারক দেশের তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ১৭তম। দেশের মোট আমদানির প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ আসে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ থেকে।
আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশে প্রধানত ভোজ্যতেল, গম, ভুট্টা, পশুখাদ্য এবং তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানি করা হয়। এর মধ্যে মোট আমদানির প্রায় ৭৫ শতাংশই ভেজিটেবল অয়েল। বছরে দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত অর্থবছর শেষ হওয়ার পর দেশভিত্তিক আমদানির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার সমান।
রপ্তানিতে এখনও পিছিয়ে আর্জেন্টিনা:
আমদানির তুলনায় আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের রপ্তানি অনেক কম। দেশটি বাংলাদেশের শীর্ষ ২০ রপ্তানি গন্তব্যের তালিকায়ও নেই। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আর্জেন্টিনায় রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পণ্য। এর মধ্যে তৈরি পোশাকই প্রধান রপ্তানি পণ্য। পাশাপাশি সীমিত পরিসরে পাটজাত পণ্যসহ আরও কিছু পণ্য রপ্তানি করা হয়।
বুন বক্স অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আক্তার হোসেন অপূর্বের মতে, আর্জেন্টিনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন বাজার তৈরির প্রচেষ্টায় দেশটি থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে পোশাক রপ্তানিও বাড়ছে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্য স্পেন। দেশটি বর্তমানে বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য দেশের মধ্যে জার্মানির পরই স্পেনে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়। আর বৈশ্বিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পর স্পেনের অবস্থান।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্পেনে বাংলাদেশ প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিজিএমইএর তথ্য বলছে, এর মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক থেকেই এসেছে ৩৬০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
স্পেনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য মূলত রপ্তানিনির্ভর। দেশটি থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্পেন থেকে আমদানি হয়েছে ১৩ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য। প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২০ টাকা হিসেবে এর মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। স্পেন থেকে আমদানি করা প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ওষুধ এবং প্রসাধনী।
বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা না পেলেও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা বরাবরের মতোই উঁচুতে। তবে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেনে আমদানির পরিমাণই বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে রপ্তানি হয়েছে ২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পণ্য। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে আমদানি হয়েছে ২৬৪ কোটি ডলারের পণ্য, যা বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, আমদানির পরিমাণের দিক থেকে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে।

