বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ জাপান। বিশাল ভোক্তা বাজার, উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর এই দেশটি বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি দেখিয়েছে, জাপানের ক্ষেত্রে সেই সাফল্য ধরা দেয়নি।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ঘুরপাক খাচ্ছে ১০০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলারের মধ্যে। এমনকি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) হওয়ার পরও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং সর্বশেষ হিসাবে আয় কমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশ ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ আয় কমেছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সঙ্গে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এই রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ১৩৬ কোটি ডলারের মধ্যে ১১৬ কোটি ডলার এসেছে পোশাক রপ্তানি থেকে।
এর আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৪১ কোটি ১৬ লাখ ডলার। ওই বছরকে ভিত্তি ধরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানের বাজার থেকে ১৬৭ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ইতিহাসে জাপানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ওই বছর দেশটিতে ১৪৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকেই আসে ১২৫ কোটি ডলার।
জাপানের তৈরি পোশাকের বাজারের আকার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি। রপ্তানিকারকদের মতে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। ফলে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। জাপানের ভোক্তার পছন্দ, মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং বাজারের ধরন অনুযায়ী আলাদা পরিকল্পনা নেওয়ার ঘাটতি রয়েছে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত গত ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তির আওতায় জাপানের বাজারে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে রপ্তানিকারকরা বলছেন, শুধু শুল্ক সুবিধা থাকলেই বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন জাপানের ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি, বিপণন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন পণ্য সংযোজন।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, জাপানের ক্ষেত্রে তেমন মনোযোগ দেয়নি। তার মতে, সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়েরই এখানে দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি অনেক আগেই কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও দেড় বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। ফজলুল হক বলেন, জাপানের সঙ্গে ইপিএ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একাই রপ্তানি বাড়ানোর নিশ্চয়তা দেবে না। কারণ তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ আগে থেকেই বড় ধরনের শুল্ক সুবিধা পেয়ে আসছিল।
তবে নতুন চুক্তিতে পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা পাওয়া যাবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে। তিনি বলেন, শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকলে হবে না। কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত করে নতুন কৌশল নিতে হবে।

